বেগুনি দেখলেই

প্রকাশিত: ১:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০২৬

বেগুনি দেখলেই

Manual4 Ad Code

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা |

ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়টা আমার কাছে সব সময়ই একটু আলাদা। অন্যদের কাছে সেটা হয়তো নিছক বসে থাকার একটা জায়গা—কেউ গল্প করে, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত থাকে, কেউবা ক্লাসের ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নিতে আসে। কিন্তু আমার কাছে পুকুরপাড় মানে ছিল দিনের শেষে একটু থামা, নিজের ভেতরটা গুছিয়ে নেওয়ার নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।

সেদিনও ঠিক তেমনই এক বিকেল। ক্লাস শেষ করে পুকুরপাড়ে বসেছিলাম। গায়ে ছিল একটা বেগুনি রঙের সাদামাটা জামা। ঠিক তখনই পরিচয় হয়েছিল ইন্টারমিডিয়েটের দুই মেয়ের সঙ্গে। নাম-পরিচয় তেমন জানাই হয়নি, শুধু কথায় কথায় জানা গিয়েছিল—তারা নিয়মিত এখানে আসে, আমার মতোই। সেদিন সময়ের অভাবে কথাবার্তা বেশি দূর গড়ায়নি। “আবার কথা হবে”—এই অসমাপ্ত আশ্বাসটুকু রেখেই উঠে পড়েছিলাম।

তারপর হঠাৎ করেই আমার আসা বন্ধ হয়ে গেল।

Manual5 Ad Code

শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। কয়েকদিনের অসুস্থতা, তার সঙ্গে মানসিক ক্লান্তি—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়াই হয়ে ওঠেনি। পুকুরপাড়ে বসা তো দূরের কথা, ক্লাসেও অনিয়ম শুরু হয়ে গেল। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল ঘরের চার দেয়ালের ভেতর।

অনেকদিন পর, এক সকালে আবার ক্যাম্পাসে গেলাম। পরিচিত পথ, পরিচিত গাছ, পরিচিত আকাশ—সবই যেন আগের মতোই আছে, শুধু আমি যেন একটু বদলে গেছি। পুকুরপাড়ের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ পেছন থেকে ডাক—

Manual5 Ad Code

“আপু!”

ঘুরে তাকিয়ে দেখি—সেই দুই মেয়ে। চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস, যেন অনেকদিনের হারানো কিছু হঠাৎ ফিরে পেয়েছে।

তারা দৌড়ে এসে এক নিশ্বাসে কত প্রশ্ন করে ফেলল— “আপু, কোথায় ছিলা?” “ক্লাসে আসো নাই কেন?” “ক্লাস বন্ধ নাকি?” “পুকুরপাড়ে বসো না কেন?”

আমি একটু হেসে বললাম, “আমি অসুস্থ ছিলাম। তাই এতদিন আসিনি। তোমরা হয়তো দেখোনি।”

কথাটা শেষ করতেই তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলল— “আমরা তো মনে করছিলাম তুমি হারিয়ে গেছ।”

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

একজন একটু থেমে, খুব সাধারণ ভঙ্গিতে কিন্তু গভীর অনুভূতি নিয়ে বলল— “প্রতিদিন এই সময়ে আমরা পুকুরপাড়ে এসে দেখতাম—তুমি আসো কিনা। আমাদের সাথে তোমার যেদিন কথা হয়েছিল, সেদিন তুমি বেগুনি রঙের জামা পড়ে ছিলা। আমরা কোনো বেগুনি রঙের জামা দেখলেই কাছে গিয়ে দেখতাম—তুমি কিনা। কতজনকে যে ভুল করে ডাক দিয়েছি!”

মুহূর্তের মধ্যে আমার বুকটা ভারী হয়ে এলো।

এত অল্প সময়ের পরিচয়, এত সামান্য কথাবার্তা—তারপরও কেউ একজন আরেকজনকে এভাবে খুঁজে বেড়াতে পারে, এটা ভাবতেই আমার চোখ জ্বালা করে উঠল। আমরা সাধারণত কাউকে মিস করলে বলি, “মিস ইউ”—এই দুই শব্দেই যেন সব দায় সেরে ফেলি। কিন্তু এরা মিস করাকে প্রকাশ করেছে অন্যভাবে—নিঃশব্দে, প্রতিদিনের অভ্যাসে, রঙের স্মৃতিতে।

Manual3 Ad Code

বেগুনি রঙ তখন আর শুধু একটা রঙ রইল না। সেটা হয়ে উঠল এক ধরনের চিহ্ন—একটা মানুষের অস্তিত্বের ইঙ্গিত।

সেদিন বুঝলাম, মানুষের অনুভূতির প্রকাশ আসলে কত রকমের হতে পারে। কেউ মুখে বলে, কেউ লেখে, কেউ চোখে জল আনে—আর কেউ কেউ শুধু অপেক্ষা করে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো দাবি ছাড়াই।

ক্যাম্পাস জীবনে আমরা কত মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। কত সম্পর্ক শুরু হয়, শেষ হয়—অনেক সময় বুঝতেই পারি না। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে, যারা অজান্তেই আমাদের জীবনে ছোট্ট একটা দাগ কেটে যায়। খুব গভীর নয়, খুব চওড়া নয়—কিন্তু একদম আলাদা।

সেই দিন থেকে পুকুরপাড়ে বসলে আমার চোখ অজান্তেই বেগুনি রঙ খোঁজে। শুধু জামায় নয়—মানুষের মনেও। এমন মন, যে সামান্য পরিচয়কেও যত্ন করে মনে রাখে।

হয়তো জীবন আমাদের খুব বেশি সময় একসাথে রাখবে না। হয়তো আবার কেউ হারিয়ে যাবে, কেউ খুঁজবে না। কিন্তু তবু কিছু মুহূর্ত থাকে, কিছু স্মৃতি থাকে—যেগুলো আমাদের বিশ্বাস করায়, মানুষ এখনো মানুষই আছে।

Manual6 Ad Code

আর কোনো এক বিকেলে, ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে, যদি হঠাৎ বেগুনি রঙের জামা চোখে পড়ে—আমি থমকে দাঁড়াবো। শুধু দেখার জন্য নয়, মনে রাখার জন্য। কারণ কখনো কখনো, কাউকে খুঁজে পাওয়ার চেয়েও—খোঁজার গল্পটাই বেশি সুন্দর।

#
সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)
শিক্ষার্থী
পদার্থবিজ্ঞান (সম্মান) ১ম বর্ষ
মুরারিচাঁদ কলেজ
সিলেট।