গণভোট অপ্রয়োজনীয় এবং প্রতারণামূলক: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

প্রকাশিত: ৯:০৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২৬

গণভোট অপ্রয়োজনীয় এবং প্রতারণামূলক: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Manual5 Ad Code
সরকার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে, জনগণকে মিথ্যাচারের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে—অভিযোগ বাম নেতাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ : সরকার জনগণকে ‘মিথ্যাচারের ফাঁদে ফেলে প্রতারণামূলকভাবে’ গণভোটের আয়োজন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, এই গণভোট শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং এটি একটি প্রতারণামূলক ভোট।

Manual7 Ad Code

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি ২০২৬) ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রচার কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

Manual5 Ad Code

‘হ্যাঁ-না ভোটে নিরপেক্ষতা থাকে না’

গণভোটের কাঠামো ও প্রশ্নপদ্ধতি নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়ে কমরেড সেলিম বলেন, “দুইটা ভোট একসঙ্গে করা হচ্ছে—একটা এমপি নির্বাচন, আরেকটা গণভোট। অথচ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মধ্যে নিরপেক্ষতার কোনো সুযোগ নেই। সেখানে তিনটা পক্ষ থাকতে পারে—হ্যাঁ, না এবং বিরত। সরকার যদি নিজেই নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়, তাহলে কীভাবে তারা নিরপেক্ষ দাবি করতে পারে?”

তিনি আরও বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয় করে সরকার নিজেই গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী।

Manual1 Ad Code

‘আট বিষয়ে একসঙ্গে হ্যাঁ-না—জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’

গণভোটের প্রশ্নপত্রের গঠন নিয়ে সমালোচনা করে সিপিবির এই সাবেক সভাপতি বলেন, “একই প্রশ্নে আটটি বিষয় জুড়ে দিয়ে আমাকে হ্যাঁ বা না বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ভেতরে অনেক উপবিভাগ আছে। আমি অর্ধেকটা মানি, অর্ধেকটা মানি না। এখন আমি কী করব? হ্যাঁ দিলে যেগুলো মানি না সেগুলোও সমর্থন করতে হচ্ছে, না দিলে যেগুলো সমর্থন করি সেগুলোর বিরুদ্ধেও ভোট দিতে হচ্ছে। এটা জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা।”

তিনি অভিযোগ করেন, এই গণভোটের মাধ্যমে সরকার জনগণের বিবেককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে এবং রাজনৈতিকভাবে জনগণকে প্রতারণার মধ্যে ফেলছে।

‘আগে নির্বাচন, পরে সংস্কার’

সংস্কার প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে কমরেড সেলিম বলেন, “আমরা সব সময় বলেছি—সংস্কার দরকার। কিন্তু সংস্কার করতে হবে জনগণের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তার জন্য আগে একটি নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। সরকার আমাদের কথা শোনেনি। এখন ভুয়া ‘ইয়েস-নো’ ভোট চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই গণভোট আমাদের ভোট নয়। জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি সঠিকভাবে নির্বাচন করুন। সংসদে গিয়েই নির্ধারিত হবে দেশ কীভাবে চলবে।”

এনসিপি ও তরুণ নেতৃত্বের সমালোচনা

অভ্যুত্থানের সামনের সারির ছাত্রনেতাদের দল এনসিপিরও কঠোর সমালোচনা করেন কমরেড সেলিম। তিনি বলেন, “আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম—স্বাধীনতার পর সংস্কার হবে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এটাই তো দেয়ালে লেখা ছিল। এখন সেই দেশকে উল্টো পথে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

এনসিপির জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “তরুণ সমাজ তো সামনে এগোনোর কথা। তারা বলেছিল সমন্বয়কারী হবে। এখন জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এটা কি সামনে এগোনো, না পেছনের দিকে যাওয়া?”

Manual3 Ad Code

তিনি আরও বলেন, “কোন যুব সমাজ সামনের দিকে না গিয়ে মধ্যযুগের দিকে দেশকে নিতে চায়? নতুন চিন্তা বাদ দিয়ে পুরোনো চিন্তায় দেশবাসীকে আবার ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা চলছে।”

সরকার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে: বজলুর রশীদ ফিরোজ

গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়ে সরকার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে মন্তব্য করে বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজন করে সরকার একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রশ্নপত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে—যেখানে কেউ দুইটিতে একমত আর দুইটিতে দ্বিমত হলে হ্যাঁ বা না কীভাবে দেবে?”

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন এখনও পর্যন্ত জনগণের সামনে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

‘সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র’

এর আগে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করে।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, “সংসদ যেন কোটিপতি, দুর্বৃত্ত ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব না হয়। সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।”

তিনি অভিযোগ করেন, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতার সুযোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করেছে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

ডাকসুর সাবেক জিএস ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত থাকায় তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারবে কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।”

তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, কালো টাকা ও পেশীশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

উপস্থিত নেতৃবৃন্দ

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও রাকসুর সাবেক ভিপি কমরেড রাগিব আহসান মুন্না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ ও সমাজতান্ত্রিক পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুবেল সিকদার।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ