মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ৩:২২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | যশোর, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ : উনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট কবি ও নাট্যকার তথা বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ।

মহাকবি মাইকেল মদুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন জমিদার। মা ছিলেন জাহ্নবী দেবী। মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবীই তাকে রামায়ন, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত করে তোলেন। তেরো বছর বয়সে মদুসূদন দত্ত কলকাতা যান এবং স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনার পর তিনি সে সময়কার হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। তিনি বাংলা, ফরাসি ও সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষালাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিশপস কলেজে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখেন। পরবর্তীতে আইনশাস্ত্রে পড়ার জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান।

মাইকেল মদুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যেও অসামান্য অবদান রেখেছেন। পাশ্চাত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ১৮৪৩ সালে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হন এবং মাইকেল উপাধি গ্রহণ করেন। ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর কীর্তির যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় তিনি মনক্ষুন্ন হয়ে পড়েন। ইংরেজি সাহিত্য থেকে দূরে সরে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মদুসূদন দত্তের কালজয়ী রচনাবলীর অন্যতম হলো মেঘনাদবধ কাব্য, দ্য ক্যাপটিভ লেডী, শর্মিষ্ঠা, ক্যাপটিভ লেডী, তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, কৃষ্ণকুমারী, বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রোঁ, পদ্মাবতী, ব্রজঙ্গনা কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, হেক্টরবধ, চতুর্দশপদী কবিতাবলী।

Manual4 Ad Code

এ মহাকবির জন্মের কারণেই সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ নদ জগৎবিখ্যাত। কালের প্রবাহে কপোতাক্ষ নদের যৌবন বিলীন হলেও মাইকেলের কবিতার কপোতাক্ষ নদ যুগে যুগে বয়ে চলেছে।

১৮৭৩ সালে ২৯ জুন কলকাতায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কলকাতায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

Manual7 Ad Code

কপোতাক্ষের পাড়ে মহাকবি

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

কপোতাক্ষের নীল জলে ভোরের আলো জাগে,
সাগরদাঁড়ির মাটিতে আজ ইতিহাস লাগে।
দত্তবাড়ির উঠোনজুড়ে নীরব স্মৃতির গান,
দুই শতাব্দী পেরিয়েও জাগে সেই মহিমান।

উনবিংশের আঁধার ভেঙে উঠেছিল যে রবি,
বাংলা ভাষার আকাশে সে—অমর এক কবি।
জাহ্নবীর কোলে শোনা রামায়ণ-মহাভারত,
শিশু মধুর কণ্ঠে তখন বেজেছিল কাব্যরত।

Manual7 Ad Code

মায়ের মুখে পুরাণকথা, দেবতা আর বীর,
শব্দের সাথে বন্ধুত্ব তার হয়েছিল গভীর।
কপোতাক্ষের ঢেউয়ের মাঝে শুনেছিল সে সুর,
সেই সুরে গড়ে উঠেছিল কবিসত্তার নূর।

কৈশোর ছুঁয়ে কলকাতায় বিদ্যার তীর্থভূমি,
হিন্দু কলেজ, জ্ঞানের আলো, বিস্তৃত ছিল ভূমি।
বাংলা-সংস্কৃত-ফরাসিতে তীক্ষ্ণ হলো বুদ্ধি,
গ্রিক-ল্যাটিনে পেলেন পরে পাশ্চাত্যের শুদ্ধি।

স্বপ্ন ছিলো ভিন্ন ভাষায় জয়ের মুকুট পরা,
ইংরেজিতে লিখে হবে বিশ্বজয়ী তারা।
খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিয়ে মাইকেল নাম ধারণ,
নিজের ভেতর ভাঙন গড়ে নতুন আত্মনির্মাণ।

কিন্তু যেথায় স্বীকৃতি নেই, সেথায় ব্যথা বাড়ে,
বিদেশি ভাষা আপন হলো না হৃদয়-ধারে।
অভিমানী আত্মা তখন ফিরল মায়ের ভাষায়,
বাংলা পেল তার নবজন্ম মাইকেলের আশায়।

Manual5 Ad Code

অমিত্রাক্ষর ভাঙল বাঁধন, ছন্দ হলো মুক্ত,
বাংলা কবিতার দেহে লাগল নবীন যুক্ত।
সনেট এলো বজ্রকঠিন চতুর্দশ পায়ে,
ভাবের গরিমা ছড়িয়ে পড়ল সাহিত্যের ছায়ায়।

মেঘনাদের বধে তিনি রাবণের পক্ষে দাঁড়ান,
পরাজিতের বেদনায় দিলেন নতুন মান।
বীরের মৃত্যু, শোকের গান, মানবতার রূপ,
কাব্যে কাব্যে জাগিয়ে দিলো প্রশ্নের অনুপ।

বীরাঙ্গনায় নারী পেলো সাহসী এক ভাষা,
ব্রজাঙ্গনায় প্রেম হলো বিদ্রোহী পিয়াসা।
তিলোত্তমার সৌন্দর্যে মুগ্ধ দেবতারা,
কবির কলমে জ্বলে ওঠে চিররূপের তারা।

নাট্যমঞ্চে শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারীর বেদনা,
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ—ব্যঙ্গের তীব্র ঘোষণা।
পদ্মাবতী, হেক্টরবধ, ইতিহাসের ঢেউ,
মাইকেলের কণ্ঠে পায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কেউ।

কপোতাক্ষ আজ শুকিয়ে গেছে কালের আঘাতে,
তবু কবির নদী বয়ে যায় অক্ষরের স্রোতে।
মাটির নদী হারায় যৌবন, কবিতার নদী নয়,
শব্দে শব্দে বহমান সে—অমর, অবিনশ্বর হয়।

অভাব, ঋণ, একাকিত্বে কেটেছে শেষ জীবন,
তবু কলম ছাড়েননি তিনি—এটাই তার ধ্যান।
কলকাতার নীরব কবর জানে সেই ইতিহাস,
কষ্টের মাঝেই জন্ম নেয় চিরকালের আভাস।

আজ দুই শতাব্দী পেরিয়েও দাঁড়িয়ে আছি আমরা,
তার কবিতার দীপ্ত আলোয় বদলায় ভাবধারা।
বাংলা ভাষার দিগন্তজুড়ে যতটা আলো ছড়ায়,
মধুসূদনের ছায়া সেথায় নিরবে হাত বাড়ায়।

হে মহাকবি, কপোতাক্ষের অমর সন্তান,
তোমার ছন্দে বাঁচবে বাংলা—চিরকাল, চিরন্তন প্রাণ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ