৩১০০ কোটি টাকার নির্বাচন: ভোট নয়, যেন ব্যয়ের মহোৎসব

প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

৩১০০ কোটি টাকার নির্বাচন: ভোট নয়, যেন ব্যয়ের মহোৎসব

Manual7 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একযোগে গণভোট আয়োজন করতে গিয়ে ব্যয়ের নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন পরিচালনা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা মাত্র দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। ভোটের আগেই এই বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এ নির্বাচন কি সত্যিই এত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, নাকি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার নামে লাগামছাড়া খরচের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে?

বিশেষ করে মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই যখন আইন-শৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দ, তখন নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভোটের চেয়ে নিরাপত্তাই বড় খাত

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত ৩১০০ কোটি টাকার ব্যয় তিনটি প্রধান খাতে ভাগ করা হয়েছে—

আইন-শৃঙ্খলা খাত: ১,৫০০ কোটি টাকা।

নির্বাচন পরিচালনা: ১,২০০ কোটি টাকা।

অন্যান্য খাত (ওসিভি, আইসিপিভি ও গণভোট): ৫০০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, ভোট গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার চেয়ে নিরাপত্তা ব্যয়ই এবার সবচেয়ে বড় খাতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নির্বাচনী পরিবেশ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে—তারই একটি প্রতিফলন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার সংকট কি রাষ্ট্রকে এমন বিপুল নিরাপত্তা ব্যয়ে ঠেলে দিচ্ছে?

১২ ফেব্রুয়ারি ভোট, ভোটার পৌনে ১৩ কোটি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় পৌনে ১৩ কোটি। ভোট গ্রহণ করা হবে সারাদেশের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে, যেখানে স্থাপন করা হবে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ।

প্রতিটি ভোটকক্ষে থাকবে গোপন ভোট প্রদানের জন্য সিল দেওয়ার আলাদা কক্ষ (মার্কিং প্লেস)। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা, যার জন্যও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, প্রবাসী ও বিশেষ শ্রেণির ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভোটের মাঠে প্রায় ১৭ লাখ লোকবল

Manual6 Ad Code

নির্বাচন পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার মাঠে নামানো হচ্ছে বিপুলসংখ্যক জনবল। ইসির হিসাব অনুযায়ী—

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা: ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য: ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন।

সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে প্রায় ১৭ লাখ লোকবল কাজ করবে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—

রিটার্নিং কর্মকর্তা: ৬৯ জন।

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা: ৫৯৮ জন।

প্রিজাইডিং অফিসার: ৪২ হাজার ৭৭৯ জন।

Manual6 Ad Code

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার: ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন।

পোলিং অফিসার: ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৪ জন।

এ ছাড়া পোস্টাল ভোটিং কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা।

Manual4 Ad Code

অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা—চাইলেই মিলছে

চলতি অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে তা পর্যাপ্ত নয়—এই যুক্তিতে জানুয়ারির শুরুতেই অর্থবিভাগে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা চেয়ে প্রস্তাব পাঠায় নির্বাচন কমিশন। অর্থবিভাগ এতে সম্মতি দিয়েছে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে চাহিদা আসছে। সে অনুযায়ী অর্থ ছাড় দেওয়া হবে। তবে চূড়ান্ত ব্যয় আরও বাড়তেও পারে।” এই বক্তব্যে ব্যয়ের অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

৫১ দল, প্রায় ২ হাজার প্রার্থী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। মোট প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৯৯৪ জন, যার মধ্যে ২৫৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবেন—

দেশীয় পর্যবেক্ষক: ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন।

বিদেশি পর্যবেক্ষক: প্রায় ৫০০ জন।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে সমালোচকদের মতে, পর্যবেক্ষকের সংখ্যার চেয়ে কার্যকর পর্যবেক্ষণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অতীত নির্বাচনের ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ব্যয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় অতীতের নির্বাচনী হিসাব থেকে—

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৪): প্রস্তাবিত ব্যয় ২,২৭৬ কোটি টাকা, বাস্তবে ব্যয় হয় প্রায় ১,৯২৭ কোটি টাকা।

একাদশ সংসদ নির্বাচন (২০১৮): প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৭০০ কোটি টাকা, পরে তা বাড়ে।

দশম সংসদ নির্বাচন (২০১৪): মোট ব্যয় প্রায় ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

নবম সংসদ নির্বাচন (২০০৮): ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকা।

Manual2 Ad Code

অষ্টম সংসদ নির্বাচন (২০০১): ব্যয় ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

সপ্তম সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬ জুন): ব্যয় ১১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি): ব্যয় ৩৭ কোটি টাকা।

পঞ্চম সংসদ নির্বাচন (১৯৯১): ব্যয় ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

প্রথম সংসদ নির্বাচন (১৯৭৩): ব্যয় ছিল মাত্র ৮১ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি ও ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। তবে গত এক দশকে যে হারে ব্যয় বেড়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

নির্বাচন কমিশনের দাবি, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতেই এই ব্যয় প্রয়োজন। তবে সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনমনে সন্দেহ থেকেই যাবে।

ভোটারদের একটি বড় অংশ যখন নির্বাচনের কার্যকারিতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয়ে, তখন প্রশ্ন উঠছে—এই ৩১০০ কোটি টাকা কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি এটি কেবলই আরেকটি ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসেবে ইতিহাসে যুক্ত হবে?

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ