দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য: ইতিহাস, রাজনীতি ও বাস্তবতার অনুসন্ধান

প্রকাশিত: ১:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য: ইতিহাস, রাজনীতি ও বাস্তবতার অনুসন্ধান

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রাসী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক মেটিকুলাস ডিজাইনের ভূরাজনীতি, শক্তির ভারসাম্য ও আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই প্রশ্ন আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে লেখক মাহমুদুর রহমানের গ্রন্থ “The Rise and Challenge of Indian Hegemon in South Asia” দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও সমকালীন রাজনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছে।

১০০০ টাকা মুদ্রিত মূল্য ও ৭৫০ টাকা ছাড়মূল্যে প্রকাশিত বইটি শুধু একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার গঠনপ্রক্রিয়া, ক্ষমতার বিবর্তন এবং সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বয়ান।

প্রাচীন অভিবাসন থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা

বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সময়পরিসর। লেখক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের সূচনা করেছেন প্রাচীন যুগে—মধ্য এশিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের অভিবাসনের ধারার মাধ্যমে। এই অভিবাসন কেবল জনসংখ্যার গতিশীলতা নয়; বরং ভাষা, সংস্কৃতি, ক্ষমতা ও রাজনীতির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—যার প্রভাব আজও বিদ্যমান।

Manual6 Ad Code

লেখকের মতে, এই ঐতিহাসিক প্রবাহই পরবর্তীকালে উপমহাদেশে একটি শ্রেণিবদ্ধ (hierarchical) রাজনৈতিক কাঠামোর জন্ম দেয়, যেখানে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তি প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস
গ্রন্থে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৭ সালের বিভাজনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ক্ষমতার ভারসাম্য সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।

Manual8 Ad Code

ভৌগোলিক আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামরিক শক্তির কারণে সঙ্গত কারণেই ভারত দ্রুত একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়।

লেখক যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক ও কৌশলগত কাঠামো ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক নেতৃত্ব’-এর জায়গায় বসিয়ে দেয়, যা পুঁজিবাদী বৈশ্বিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক পুঁজির আধিপত্যবাদী নীতিতে রূপ নেয়।

হেজেমনির ধারণা ও বাস্তব প্রয়োগ

বইটির মূল আলোচ্য বিষয় হলো “Indian Hegemony”—ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের উত্থান ও তার চ্যালেঞ্জসমূহ। লেখক দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে কূটনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে ভারত তার অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিভিন্ন পর্যায় এখানে বিশ্লেষিত হয়েছে। কোথাও সহযোগিতা, কোথাও সন্দেহ, আবার কোথাও সরাসরি দ্বন্দ্ব—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও প্রতিরোধের রাজনীতি

লেখক শুধু ভারতের আধিপত্যের উত্থান নয়, এর বিরুদ্ধে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলোকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। চীন의 ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে ভারতের হেজেমনিক অবস্থান যে প্রশ্নবিদ্ধ, তা বইটিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘একক নেতৃত্ব’ বনাম ‘সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক আঞ্চলিকতা’—এই দ্বন্দ্বকে লেখক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

Manual7 Ad Code

গবেষণাভিত্তিক ও বিতর্ক-উদ্দীপক গ্রন্থ

Manual7 Ad Code

The Rise and Challenge of Indian Hegemon in South Asia একটি গবেষণাভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ এবং বিতর্ক-উদ্দীপক গ্রন্থ। ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হতে পারে।

একই সঙ্গে, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কাঠামো কেমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আগ্রহীদের জন্য বইটি চিন্তার খোরাক জোগায়।

উপসংহার

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে। মাহমুদুর রহমানের এই বই সেই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সচেতন পাঠকদের জন্য গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ