বিদ্যুৎ ও চুম্বক কি?

প্রকাশিত: ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০২৬

বিদ্যুৎ ও চুম্বক কি?

Manual7 Ad Code

ড. সুশান্ত দাশ |

বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব: প্রকৃতিতে এক মহাশক্তির দুই রূপ

বিজ্ঞান পড়তে শুরু করলে তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই কয়েকটি সহজ কিন্তু গভীর প্রশ্ন করে বসে। যেমন—

· বিদ্যুৎ আসলে কী?

Manual1 Ad Code

· চৌম্বকত্ব কী?

· এদের মধ্যে সম্পর্ক কোথায়?

· আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এদের এত গুরুত্ব কেন?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সত্য— বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব আসলে দুটি আলাদা ঘটনা নয়; তারা একই মৌলিক শক্তির দুইটি ভিন্ন প্রকাশ। এই সম্মিলিত শক্তিকে বলা হয় তড়িৎচৌম্বকত্ব (Electromagnetism)।

চলুন বিষয়টি ধাপে ধাপে সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

বিদ্যুৎ কী?

বিদ্যুতের মূল ধারণাটি জড়িয়ে আছে বৈদ্যুতিক আধানের সঙ্গে। আধান পদার্থের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

প্রত্যেকটি পরমাণুর ভিতরে থাকে তিন ধরনের কণা—

· ইলেকট্রন — ঋণাত্মক আধান যুক্ত

· প্রোটন — ধনাত্মক আধান যুক্ত

· নিউট্রন — নিরপেক্ষ ।

সাধারণ অবস্থায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের ভারসাম্য থাকে। কিন্তু এই ভারসাম্য ভেঙে গেলে বৈদ্যুতিক ঘটনা দেখা দেয়।

বিদ্যুৎ সাধারণত দুইভাবে প্রকাশ পায়।

স্থির বিদ্যুৎ

যখন আধান একটি স্থানে জমা হয় কিন্তু চলাচল করে না, তখন তাকে বলা হয় স্থির বিদ্যুৎ।

উদাহরণস্বরূপ, শুকনো চুলে একটি প্লাস্টিকের চিরুনি ঘষলে তা ছোট কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে। কারণ চিরুনির গায়ে আধান জমে যায়।

Manual7 Ad Code

তড়িৎ প্রবাহ

যখন আধান কোনো পরিবাহকের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত চলতে থাকে, তখন তাকে বলা হয় তড়িৎ প্রবাহ বা কারেন্ট।

Manual7 Ad Code

পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় তড়িৎ প্রবাহকে সংজ্ঞায়িত করা হয়—

I = Q/t

এখানে

I= তড়িৎ প্রবাহ
Q= আধানের পরিমাণ
t= সময়

অর্থাৎ কোনো পরিবাহকের একটি বিন্দু দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যত আধান অতিক্রম করে, সেটিই তড়িৎ প্রবাহ।

কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন উঠে আসে।

বিদ্যুৎ কি সত্যিই ইলেকট্রনের প্রবাহ?

প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে প্রায়ই বলা হয়— বিদ্যুৎ হলো ইলেকট্রনের প্রবাহ।

কথাটি আংশিকভাবে ঠিক হলেও পুরো সত্যটি একটু বেশি সূক্ষ্ম।

আসলে ইলেকট্রনগুলি তারের ভেতর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে জলপ্রবাহের মতো দ্রুত ছুটে যায় না।

বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন।

ধাতব পরিবাহকের ভেতরে কী ঘটে?

তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো ধাতুর মধ্যে পরমাণুগুলি একটি সুশৃঙ্খল বিন্যাসে থাকে। এদের কিছু ইলেকট্রন তুলনামূলকভাবে আলগা বন্ধনে আবদ্ধ থাকে এবং ধাতুর মধ্যে চলাচল করতে পারে। এগুলিকে বলা হয় পরিবাহী ইলেকট্রন।

তবে এই ইলেকট্রনগুলি সব সময় এলোমেলোভাবে চলতে থাকে। তারা ক্রমাগত পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং দিক পরিবর্তন করে।

যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বাহ্যিক প্রভাব না থাকে, এই চলাচল সম্পূর্ণ এলোমেলো।

ফলে গড় চলন শূন্য থাকে, অর্থাৎ কোনো তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয় না।

ভোল্টেজ প্রয়োগ করলে কী হয়?

যখন একটি ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ উৎস তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন পরিবাহকের ভেতরে একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

এই ক্ষেত্র ইলেকট্রনের এলোমেলো গতির ওপর সামান্য একটি পক্ষপাত তৈরি করে। ফলে ইলেকট্রনগুলো ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট দিকে সরে যেতে থাকে।

এই ধীর গড় গতিকে বলা হয় ড্রিফট গতি।

সাধারণ তারের মধ্যে এই গতি অত্যন্ত ধীর—প্রায় প্রতি সেকেন্ডে মিলিমিটারেরও কম।

অর্থাৎ ইলেকট্রনগুলি অত্যন্ত ধীরে এগোয়।

তবু আমরা যখন সুইচ টিপি, তখন বাতি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে ওঠে।

এর কারণ কী?

আসলে কী প্রবাহিত হয়?

এখানেই বিষয়টির মূল রহস্য।

বিদ্যুৎ শক্তি মূলত ইলেকট্রনগুলো ব্যাটারি থেকে বাতি পর্যন্ত ছুটে যাওয়ার মাধ্যমে পরিবাহিত হয় না। বরং ব্যাটারি পুরো সার্কিট জুড়ে একটি তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।

এই ক্ষেত্র প্রায় আলোর বেগে সার্কিটের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারের সর্বত্র ইলেকট্রনগুলো একযোগে তাদের ড্রিফট গতি শুরু করে।

একটি সহজ তুলনা করা যায়।

ধরা যাক একটি লম্বা নল মার্বেল দিয়ে ভর্তি। যদি এক প্রান্ত থেকে একটি মার্বেল ঠেলা হয়, অন্য প্রান্ত থেকে একটি মার্বেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে। কিন্তু কোনো একক মার্বেল পুরো নলটি অতিক্রম করে না।

তেমনি ইলেকট্রনগুলো সামান্য সরে যায়, কিন্তু শক্তির প্রভাব দ্রুত সারা ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।

শক্তির প্রবাহ কোথায় ঘটে?

তড়িৎচৌম্বক তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে শক্তির প্রবাহকে বর্ণনা করা যায় একটি রাশির সাহায্যে, যাকে বলা হয় পয়েন্টিং ভেক্টর।

S = E X B

এখানে

E হলো বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র
B হলো চৌম্বক ক্ষেত্র । (তবে এটা একটা ভেক্টর গুণ। যারা ভেক্টর বীজগণিত বোঝে, তাদের পক্ষে বোঝা সহজ।)

Manual1 Ad Code

এই সমীকরণ দেখায় যে শক্তি মূলত পরিবাহকের চারপাশের তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়।

তার বা পরিবাহক মূলত সেই শক্তির প্রবাহকে পরিচালিত করার পথ তৈরি করে।

এখন বলা যাক,

চৌম্বকত্ব কী?

চৌম্বকত্ব এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যেখানে কিছু বস্তু চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।

একটি চুম্বকের দুটি মেরু থাকে—

· উত্তর মেরু

· দক্ষিণ মেরু

বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে, আর একই মেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে।

চুম্বকের চারপাশের যে অঞ্চলে এই প্রভাব অনুভূত হয় তাকে বলা হয় চৌম্বক ক্ষেত্র।

বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের সম্পর্ক

একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা।

কিন্তু উনিশ শতকের গোড়ায় ডেনমার্কের বিজ্ঞানী
Hans Christian Ørsted
দেখান যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত তারের পাশে একটি কম্পাস রাখলে তার সূচক সরে যায়।

অর্থাৎ তড়িৎ প্রবাহ চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।

পরবর্তীকালে আরেক বিজ্ঞানী
Michael Faraday
আবিষ্কার করেন বিপরীত ঘটনাটি— পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।

এই ঘটনাকে বলা হয় তড়িৎচৌম্বক আবেশ।

মহান ঐক্য

এই সমস্ত আবিষ্কারকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব নির্মাণ করেন স্কটিশ পদার্থবিদ
James Clerk Maxwell।

তার সমীকরণগুলো দেখায় যে বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব আসলে একই ক্ষেত্রের দুইটি দিক— তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্র।

ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব আরও একটি বিস্ময়কর সত্য প্রকাশ করে— আলো নিজেই একটি তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব এবং আলো—এই তিনটিই একই মৌলিক প্রাকৃতিক ঘটনার প্রকাশ।

আমাদের জীবনে এর গুরুত্ব

আধুনিক সভ্যতা অনেকটাই তড়িৎচৌম্বকত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
মোটর অসংখ্য যন্ত্র চালায়।
রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট তথ্য পরিবহন, করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলে, সবই তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে।
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায়ও বিভিন্ন যন্ত্রে এর ব্যবহার রয়েছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, তড়িৎচৌম্বকত্ব ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবন কল্পনাই করা যায় না।

উপসংহার

বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব প্রকৃতির দুটি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ঘটনা।

আধান থেকে জন্ম নেয় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র।
আধানের গতি সৃষ্টি করে চৌম্বক ক্ষেত্র।
পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র আবার তড়িৎ প্রবাহ তৈরি করতে পারে।

বিদ্যুৎ সার্কিটে ইলেকট্রন ধীরে ধীরে সরে গেলেও শক্তির প্রবাহ ঘটে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে।

এইভাবে আধান, গতি এবং ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকৃতির এক অপূর্ব ঐক্যের চিত্র তুলে ধরে।
#
ড. সুশান্ত দাশ
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সাবেক ভিসি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
পলিটব্যুরো সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ