অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এফওপিএল চালুর তাগিদ

প্রকাশিত: ৩:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২৬

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এফওপিএল চালুর তাগিদ

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২৬ : বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত (Ultra-Processed Food) খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা বা ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (Front-of-Pack Labeling-FOPL) চালু করা গেলে ভোক্তারা এক নজরেই খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বির উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন সহজ হবে। এজন্য এফওপিএল-সংক্রান্ত খসড়া প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল): প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়” শীর্ষক দুই দিনব্যাপী (১৪-১৫ জুলাই) সাংবাদিক কর্মশালার সমাপনী দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

Manual4 Ad Code

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় বেসরকারি গবেষণা ও নীতি-অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) কর্মশালার আয়োজন করে। এতে দেশের প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের ২৫ জন সাংবাদিক অংশ নেন।

মৃত্যুর বড় কারণ অসংক্রামক রোগ

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের (NCDs) কারণে ঘটে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ মৃত্যু অকাল মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের মতো রোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নগরায়ণ, ব্যস্ত জীবনযাপন, সহজলভ্যতা এবং আগ্রাসী বিপণনের কারণে প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ ভোক্তা এসব খাদ্যের প্রকৃত পুষ্টিগুণ কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নন।

কেন প্রয়োজন ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং

আলোচনায় বলা হয়, বর্তমানে অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের পেছনের অংশে পুষ্টি-তথ্য থাকলেও তা সাধারণ ভোক্তার জন্য জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট অক্ষরে লেখা থাকে। ফলে ক্রেতারা কেনাকাটার সময় সহজে তা বুঝতে পারেন না।

ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং চালু হলে খাদ্যপণ্যের সামনের অংশেই স্পষ্ট সতর্কীকরণ চিহ্ন বা বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে, পণ্যটিতে লবণ, চিনি কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে কি না। এর ফলে ভোক্তা অল্প সময়েই তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে পারবেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা শুধু ভোক্তার সচেতনতা বাড়াবে না; বরং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পণ্যের উপাদান আরও স্বাস্থ্যসম্মত করার জন্য উৎসাহিত করবে।

Manual3 Ad Code

দ্রুত প্রবিধান চূড়ান্তের আশ্বাস

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, বাধ্যতামূলকভাবে এফওপিএল চালুর লক্ষ্যে প্রবিধানমালার খসড়া দ্রুত চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে চলছে।

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, “বাধ্যতামূলকভাবে এফওপিএল চালুর জন্য দ্রুতই প্রবিধানমালার খসড়া চূড়ান্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

তার মতে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর খাদ্যনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ইতিবাচক

ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল বাস্তবায়নের ফলে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল বাস্তবায়নের ফলে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমেছে। বাংলাদেশেও এটি চালু করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, ভোক্তাদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।

ভোক্তা সচেতনতা বাড়াবে এফওপিএল

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তা সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য চিহ্নিত করতে পারবেন।

তার ভাষায়, “অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ভোক্তাকে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচনে সহায়তা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”

গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান বলেন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এফওপিএল বিষয়ে গণমাধ্যমের ধারাবাহিক ও তথ্যসমৃদ্ধ সংবাদ প্রকাশ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, “অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ নীতিনির্ধারকদের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি করবে।”

বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ

কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা)-এর কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ ও মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন প্রজ্ঞার কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা। উপস্থাপনায় এফওপিএলের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং নীতিগত অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

Manual7 Ad Code

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিগত পদক্ষেপের দাবি

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। এফওপিএল সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তারা মনে করেন, বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ লেবেল চালু হলে ভোক্তারা আরও সচেতন হবেন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের বোঝা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা যুক্ত করা এখন আর শুধু একটি নীতিগত উদ্যোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তাই খসড়া প্রবিধান দ্রুত চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ