বৈষম্য আর শোষণ মুক্তির প্রবক্তা রাজা আলী ছবদর খানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২৬

বৈষম্য আর শোষণ মুক্তির প্রবক্তা রাজা আলী ছবদর খানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual4 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | কুলাউড়া (মৌলভীবাজার), ১৬ জুলাই ২০২৬ : বৈষম্য আর শোষণ মুক্তির প্রবক্তা, বামপন্থী সংগ্রামী জননায়ক, কিংবদন্তি বিপ্লবী, কৃষক সমিতি ও ন্যাপ (ভাসানী) নেতা, জনতার রাজা হিসেবে খ্যাত রাজা আলী ছবদর খানের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) পৃথিমপাশার সুলতান কমপ্লেক্সে বিকেল ৩টায় রাজা আলী ছবদর খানের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।

Manual3 Ad Code

আয়োজিত স্মরণসভা নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি সময়ের প্রয়োজন—একজন সংগ্রামী মানুষকে স্মরণ করার মাধ্যমে প্রজন্মকে তাঁর আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান।

স্মরণসভা আয়োজন কমিটির পক্ষে মাহমুদুর রহমান চৌধুরী ওয়েছ ও আব্বাছ আলী সবাইকে এ আয়োজনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যারা দেশ-বিদেশে আছেন, যারা রাজনীতি বা সমাজ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের উচিত রাজা আলী ছবদর খানের মতো মানুষদের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো। কারণ, স্মৃতি ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কাজ। রাজা আলী ছবদর খানের জীবন এক আলোকবর্তিকা—যে আলো আজকের ক্লান্ত সমাজকে দেখাতে পারে নতুন পথ, দেখাতে পারে সাহসের অর্থ কীভাবে সংগ্রামে পরিণত হয়। তাঁর মতো সংগ্রামীদের জীবনচর্চাই হতে পারে ভবিষ্যতের নতুন বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম ভিত।

সংগ্রামী রাজা সাহেব

রাজা সাহেবের জীবন ছিল রাজনৈতিক। সারা জীবন তিনি মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অনুগত ছিলেন এবং তার রাজনীতিতে মূল বিষয় ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধিতা। তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতি ও ন্যাপের নেতা ছিলেন। রাজা আলী ছফদর খান ছিলেন পুরোপুরি বামপন্থী সংগ্রামী জননায়ক। “ব্যাপক অর্থে তিনি বিপ্লবী ছিলেন”। তাঁর জন্ম ১৬ই আগষ্ট ১৯১৯ হাজারদুয়ারী মুর্শিদাবাদ, মৃত্যু ১৬ জুলাই ১৯৭৪, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকা।

তাঁর বাল্য ও কৈশোর কলিকাতায় নওয়াব হাবেলীতে কেটেছে। তিনি কলিকাতার থ্রি-হান্ড্রেড ক্লাবের মেম্বার ছিলেন। এই ক্লাবের সদস্যের মধ্যে ছিলেন বর্ধমানের রাজকুমার শ্রী শ্রীষ চন্দ্র রায়, ময়মনসিংহের মহারাজ পুত্র স্নেহান্সু আচার্য্য প্রমুখ। উক্ত স্নেহাংশু আচার্য্যের সান্নিধ্যে রাজা সাহেবের বাম রাজনীতির হাতে খড়ি বলে জানা যায়। এইভাবে লক্ষপতি পরিবারের সন্তান ও আদুরে দুলালদের সাথে লালিত-পালিত হন রাজা সাহেব। বৃহত্তর সিলেটের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে পৃথিমপাশা জমিদার পরিবারের অবস্থান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ বাড়িতে ১৯৫০ সালে ইরানের শাহানশাহ আগমন করেছিলেন। উনার সম্মানার্থে বাঘ শিকারের আয়োজন করা হয়েছিল।

কিভাবে দেশের নীচতলার খেটেখাওয়া কৃষক, মজুর এর মাঝে একাত্ম হয়েছিলেন, তা সত্যি অবাক করার মতো। জমিদার পিতার ঐশ্বর্য্য, প্রাচুর্য্য, ক্ষমতা, বিলাসিতা কোন কিছুই তাকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। একেবারে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন সাধারণ কৃষকের মাঝে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নিজ পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁর এ কর্মতৎপরতা এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আদর্শের জন্য তিনি দু:খের কঠিন ব্রত পালন করেছেন, পৈতৃক ভদ্রাসন থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, অভাব, অনটনের মধ্যে দিন কাঠিয়েছেন। সেদিন সুবিধাবাদের সাথে সহ অবস্থান করলে গাড়ি-বাড়িসহ অনেক লোভনীয় পদ ও পদবী যে সহজেই তার করায়ত্ব হত, সে সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন থেকেও সে পথে তিনি পা বাড়াননি। আদার্শের প্রতি এমন আনুগত্য বর্তমান সমাজে সত্যিই দুর্লভ। এর জন্য সামন্তবাদ তাঁকে পরিহার করলেও সাধারণ জনগণ তাকে আপন করে নিলো চিরদিনের জন্য। এই স্বপক্ষ ত্যাগী জমিদার নন্দন যেভাবে সামন্তবাদ ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেলেন, তা ভাবতেও অবাক লাগে। আলী ছফদর খান রাজা সাহেব যে ইতিহাসের বিচারে এবং জনতার বিচারে এই পরিবারের সর্বাধিক সমাদৃত ও জননন্দিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ বোধ খুব কমই থাকবে। রাজা সাহেব নেই, রাজা সাহেব বেঁচে থাকবেন জনগণের হৃদয়ে।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। উক্ত নির্বাচনের প্রাক্কালে মৌলভীবাজার শহরে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিমলীগ সরকার তাদের গুন্ডা বাহিনি দিয়ে বিরোধী দলের (কপ) কার্যালয় দখল করে তালাবদ্ধ করে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন সম্ভাব্য একটি দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। এহেন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে রাজা সাহেবের সাহসী পদক্ষেপের কারণে প্রশাসন বিরোধী দলের অফিস খুলে দিতে বাধ্য হন। তখনকার সময় এসব একটু দুঃসাহসিক ঘটনা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারি সম্মেলনে রাজা সাহেব যোগ দিয়েছিলেন। বলা যায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে মওলানা ভাসানী আহুত অধিকাংশ কৃষক সম্মেলনে উনার স্বতস্ফুর্ত উপস্থিতি ছিল।

Manual6 Ad Code

১৯৬৩ সালে বালিসিরা কৃষক আন্দোলনে অন্যতম একজন নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন, চা শ্রমিক সংঘের সাথে সক্রিয় সহযোগিতা রেখেছেন এবং শ্রমিক আন্দোলন ও পাহাড় কামলাদের সংগঠিত করা ও তাদের ন্যায্য দাবী-দাওয়ার আন্দোলনে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৬৪ সালে সম্মিলিত বিরোধী দল এর (কপ) প্রার্থী হিসেবে মেম্বার অব ন্যাশন্যাল এসেম্বলিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

Manual5 Ad Code

১৯৬৫ সালে ভারত তৎকালীন পাকিস্তান আক্রমণ করলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা কল্পে স্থানীয়ভাবে মোজাহিদ বাহিনী গঠন করে সেনাবাহিনীর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন।

১৯৬৬ সালে কৃষক সমিতির সিলেট জেলা সম্মেলন পৃথিমপাশায় অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনের মূল আয়োজক ছিলেন রাজা সাহেব।

১৯৬৭ সালে কুলাউড়ায় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাজা সাহেব ছিলেন, উক্ত সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি।

১৯৬৯ সালে গণঅভুত্থানে তাঁর ছিল প্রশংসনীয় ভুমিকা। এ আন্দোলনে তিনি ছাত্রদের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন।

আইয়ুবের পতনের পর ১৯৭০ এর নির্বাচন মাওলানা ভাসানী বর্জন করেন। ভাসানী অনুসারীদের গণহারে গ্রেফতার করা হয়। রাজা সাহেবের উপরও গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হয়। রাজা সাহেব ছিলেন সত্যিকার দেশপ্রেমিক, যাহার তুলনা হয় না।

১৯৭০ সালে দেশে স্বাধীনতার আবহাওয়া। বুর্জোয়া নেতৃত্বের আপোষ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার স্লোগানে কমরেড কাজী জাফর ও কমরেড রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে যখন সশস্ত্র সংগ্রামের ধারণা প্রচার ও তা সংঘটিত করার প্রচেষ্টারত ওই সময় রাজা আলী ছফদর খান তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট এহিয়ার সামরিক শাসনে সবাই আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। তাদের অনেকেই পৃথিমপাশার ছোট সাহেব বাড়ি নিরাপদ ভেবে অবস্থান নিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে নিজের জীবনবাজি রেখে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ত্রিপুরার তৎকালীন মহকুমা শহর কৈলাশহরের অদূরে গৌড়নগর নামক স্থানে পরিবার নিয়ে অবস্থান করেন।

১৯৭১ সালে ৩০/৩১ মে কলকাতার বেলেঘাটায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবাসী বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের দুদিন ব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দিনাজপুরের ভাসানি ন্যাপ নেতা বরদা চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মওলানা ভাসানি আহবায়ক ও কমরেড অমল সেন সদস্য সচিব করে “জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি” গঠিত হয়। অত:পর রাজা সাহেব উক্ত কমিটির সাথে যুক্ত হলেন। কৈলাশহরকে কেন্দ্র করে রাজা সাহেব মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিদের সংগঠিত করলেন। তার সক্রিয় উপস্থিতি ও নেতৃত্বে পৃথিমপাশা সামরিক ছাউনি, ডাকঘর ও মুড়ইছড়া চা বাগানসহ বিভিন্ন শত্রু ঘাটিতে স্বার্থক গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করেছেন। একজন বেসামরিক ও পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি এর দু:সাহসিক কার্যক্রম দেখে অনেক ভারতীয় সেনা অফিসার বিস্মিত হয়েছেন।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী কর্তৃক দেয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কুলাউড়া স্কুল চৌমুহনীতে সমাবেশ করেন। সেই সময়ে ইহা একটি দু:সাহসি ঘটনা হিসেবে খ্যাত।

১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ জাসদের রাজনৈতিক কর্মী ছাত্রনেতা মনুসহ যাদেরকে কুলাউড়া থানার লকাপে রাখা হয়েছিল, রক্ষিবাহিনীর সামনে লকাপ ভেঙ্গে তাদেরকে মুক্ত করে দেন। এই ছিলেন রাজা সাহেব।

রাজা সাহেব স্বাধীনতা যুদ্ধের অকুতোভয় বীর সেনানী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক বিরাট সহায়ক শক্তি ছিলেন।

স্বাধীনতা লাভের পর, দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবক্ষয় দেখে একেবারে হতাশ হয়ে গিয়েও তার প্রতিরোধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

জনগণকে নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়েছিলেন।

মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ ও কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজা আলী ছফদর খানের স্মৃতির প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তিনি এমন একজন মানুষ যাকে সত্যি ভুলা যায় না।

Manual5 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ