২৬ বছরেও সাংবাদিক শামসুর রহমান হত্যার বিচার হয়নি

প্রকাশিত: ১০:০৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২৬

২৬ বছরেও সাংবাদিক শামসুর রহমান হত্যার বিচার হয়নি

Manual8 Ad Code

রেজাউল ইসলাম |

দীর্ঘ ২৬ বছরেও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিক জনকন্ঠের তৎকালীন বিশেষ প্রতিনিধি শামসুর রহমান কেবল হত্যাকান্ডের বিচার হলোনা। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতায় সাহসী সাংবাদিকতা ও একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারনেই সন্ত্রাসীরা ২০০০ সালের ১৬ জুলাই যশোর জনকন্ঠ অফিসে কর্মরত অবস্হায় কেবল ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। তখন ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দাবীদার আওয়ামীলীগ। কেবল ভাইও ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের একজন অকুতোভয় কলম সৈনিক।
হত্যাকান্ডের পরদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সাহেব যশোর এসে কেবলের জানাযায় শরীক হয়েছিলেন ( আজ পরপারে)। তিনি যশোরবাসীকে এ হত্যাকান্ডের বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরবর্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দলীয় সমাবেশে যশোর আসলে যশোরের সাংবাদিক সমাজ ও সুধী মহল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করে কেবল হত্যার বিচারের দাবী জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেবারের আলীগের মেয়াদ পার হয়। ২০০১ ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ইয়াজউদ্দিন হয়ে দুই বছর মইন ইউ ব্যাক ফখরুদ্দিন সরকার। ২০০৮ এর নির্বাচনে আবার আওয়ামীলীগ সরাকার এসে একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে। অথচ সাংবাদিক শামসুর রহমান হত্যা মামলার বিচার তারা করেনি।

Manual8 Ad Code

২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগের পতনের পর ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে । ২০২৬ সালের ১২ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার আবারো ক্ষমতায় এসেছে। তবে এবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ( সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন )। বিচার হয়না বলে আগের মতো বিচার চেয়ে চিৎকার করেনা তার স্ত্রী শিক্ষিকা সেলিনা রহমান, মেয়ে সেজুতি রহমান, ছোটভাই জনকন্ঠের যশোর প্রতিনিধি সাজেদ রহমান বকুল। হয়তো রাতে বিছানায় নিরবে চোখের পানি ফেলে। যশোরের সাংবাদিক সমাজতো বিচারের দাবীতে কম কর্মসূচী পালন করেনি। তার স্ত্রী ও পরিবার তো আইনী লড়াই কম করেনি। বিচার চেতে চেতে গলা ভেঙে ও শুকিয়ে গেছে। ভাঙা ও শুকনো গলা দিয়ে এখন আর জোরে আওয়াজ বের হয় না।
এ হত্যাকান্ডের দু’বছর আগে যশোরের রানার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুলকেও সন্ত্রাসীরা হত্যা করে। মুকুল হত্যার বিচারেরও একই পরিনতি। এত বছরে এ দুই হত্যাকান্ডের আসামীদের বেশীরভাগই হয়তো পরপারে। তারপরও এ দুই অকুতোভয় সাংবাদিক হত্যার আবারো বিচার দাবী করি আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সাথে দুই সাংবাদিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সাংবাদিক শামসুর রহমান ও সাইফুল আলম মুকুল হত্যা মামলা প্রমাণ করে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। সরকার আসে, সরকার যায় অথচ এ দুই সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না। বর্তমান সরকারের কাছে এ দুই সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য আকুতি জানাচ্ছি।
#
সাংবাদিক
রেজাউল ইসলাম
ঝিনাইদহ।

বিচারের অপেক্ষায় দুই কলমসৈনিক

শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

আজও ভোরের সূর্য ওঠে, আজও নামে সন্ধ্যাবেলা,
বাংলার পথে জেগে থাকে রক্তমাখা সেই মেলা।
মানুষ বাঁচে, মানুষ মরে, সময় নদী বয় অবিরাম,
তবু থেমে থাকে ইতিহাস, শামসুর রহমান কেবল—একটি নাম।

যশোর নগর জানে এখন কেমন ছিল সেই প্রহর,
সংবাদঘরের টেবিলজুড়ে জমেছিল কত দিনের স্বর।
কলম হাতে সত্য লিখে, অন্যায়কে করতেন ক্ষয়,
সেই অপরাধেই বন্দুকধারী কেড়ে নিল জীবনময়।

ষোলো জুলাই—রক্তলেখা, কাঁদল সেদিন জনপদ,
কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সংবাদপত্র, মানুষের হৃদয়।
অফিসঘরে কর্মরত এক নির্ভীক সংবাদযোদ্ধা,
গুলির শব্দ লিখে দিল ইতিহাসের কালো ব্যথা।

তিনি ছিলেন কেবল নন, ছিলেন একটি বিবেকধ্বনি,
অন্যায় দেখে নীরব থাকা শেখেননি তো কোনোদিনই।
জনকণ্ঠের পাতায় পাতায় সত্য ছিল তাঁরই শপথ,
সেই শপথের মূল্য দিতে জীবন হলো রক্তস্নাত।

Manual7 Ad Code

দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল তাঁরই এক পরিচয়,
ক্ষমতার নয়, সত্যের পথে ছিল তাঁর অবিচল জয়।
অনুসন্ধানী প্রতিটি লেখা কাঁপিয়েছিল দুর্বৃত্তদল,
তাই তো শেষে বুলেট এসে থামিয়ে দিল জীবনচল।

Manual8 Ad Code

কাঁদল সেদিন সহকর্মীরা, কাঁদল দেশের সাংবাদিক,
কাঁদল শুধু পরিবারেরই নয়—কাঁদল জনতার বিবেকও ঠিক।
স্ত্রীর চোখে অশ্রু নেমে প্রশ্ন হলো নিরবধি—
“সত্য লিখে মৃত্যুই যদি মেলে, তবে ন্যায় কোথায় বলি?”

কন্যার চোখে শূন্য আকাশ, বাবার ছবি নীরব চেয়ে,
বছর গুনে কেটে গেছে কত, স্মৃতি আজও বুকে বয়ে।
ছোট ভাইও লড়ে গেছেন আইনের দীর্ঘ অন্ধপথে,
প্রতীক্ষা শুধু বিচার নামে আলোর একটি দিনের রথে।

শোকের পরে এলো প্রতিশ্রুতি, এলেন কত রাষ্ট্রনায়ক,
সান্ত্বনারই ভাষা দিলেন, আশ্বাস দিলেন বহুবার।
বলেছিলেন—”বিচার হবে, দোষী পাবে কঠিন শাস্তি”,
বছর গিয়ে দশক হলো, ফেরেনি সেই ন্যায়ের বাতি।

Manual7 Ad Code

সরকার এলো, সরকার গেল, পাল্টেছে কত ক্ষমতার রঙ,
বদলেছে কত মন্ত্রিসভা, বদলেছে রাজনৈতিক ঢঙ।
কিন্তু কেন বদলায় না শুধু বিচারহীন রাতের ঘোর?
কেন আজও ন্যায়ের দুয়ারে ঝুলে থাকে তালা ভর?

স্বাধীনতার পক্ষে যারা বলেছিলেন দৃপ্ত কণ্ঠে,
তাঁরাও কেন পারেননি শেষ সত্যকে আনতে সম্মুখপথে?
যারা এলেন পরবর্তীতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে,
তারাও কেন ফিরলেন শেষে অপূর্ণতার স্মৃতি দিয়ে?

সময় শুধু এগিয়ে গেছে, ক্ষতটি কিন্তু শুকায়নি,
রক্তমাখা সেই দুপুরটি ইতিহাস থেকে মুছায়নি।
ছাব্বিশ বছর—কম তো নয়, একটি প্রজন্ম পেরিয়ে যায়,
তবু বিচার অদৃশ্য থাকে, নীরব থাকে রাষ্ট্রের ন্যায়।

এই তো শুধু একটি নয়—আরেকটি নাম জাগে সাথে,
সাইফুল আলম মুকুল ছিলেন কলম যুদ্ধের একই পথে।
রানারের সেই সম্পাদকও প্রাণ দিয়েছেন একই দামে,
দুইটি জীবন একই প্রশ্ন তোলে জাতির বিবেকখানে।

দুইটি কবর পাশাপাশি যেন ইতিহাসের নীরব গান,
দুইটি কলম প্রশ্ন তোলে—কোথায় ন্যায়ের বাংলাদেশ আজ?
কলম যদি থামে গুলিতে, সত্য যদি ভয়ে মরে,
স্বাধীনতার গৌরব তবে কোন আলোয় আজ ঘরে ঘরে?

সাংবাদিকের কাজটি শুধু খবর লেখা নয় কখনো,
মানুষেরই অধিকারকে তুলে ধরা নির্ভয়ে যেন।
সেই কণ্ঠ যদি স্তব্ধ হয় সন্ত্রাসীরই বুলেটছোঁয়ায়,
গণতন্ত্রও আহত হয়ে দীর্ঘশ্বাসে দিন গুনে যায়।

যে শিশুটি বাবার কোলে ঘুমিয়ে ছিল সেদিন রাতে,
আজ সে বড়—তবু বাবাকে খুঁজে ফেরে স্মৃতিপাতে।
যে স্ত্রী একদিন কেঁদেছিলেন আদালতের সিঁড়ি ধরে,
আজও তাঁরই চোখের ভাষা জমে থাকে নিঃশব্দ ঝরে।

কত আবেদন, কত মিছিল, কত স্মারক, কত দাবি,
কত কলম লিখেছে শুধু বিচারেরই অনন্ত ছবি।
গলা ভেঙে গেছে কতজনের, শুকিয়ে গেছে উচ্চারণ,
তবু ন্যায়ের আবেদন আজও হারায়নি শেষ স্পন্দন।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি জাতির বুকে ক্ষতের মতো,
অন্যায় দেখে নীরব থাকা সবচেয়ে বড় লজ্জা যত।
যেখানে খুনিরা হাসে মুক্ত, ভুক্তভোগী কাঁদে নীরব,
সেখানে আইনের শাসন কেবল কাগজে লেখা শব্দরব।

রাষ্ট্র যদি সত্যি চায় মানুষেরই আস্থা ফিরে,
তবে বিচার হোক নিরপেক্ষ আইনসম্মত আলোর নীড়ে।
প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, চাই না কোনো রোষের আগুন,
চাই কেবলই সত্যের জয়, ন্যায়বিচারের নির্মল গুণ।

আজ যারা আছে ক্ষমতার শীর্ষে দেশের দায়িত্ব কাঁধে,
তাঁদের প্রতি বিনীত ডাকে উচ্চারিত হোক এই সাধে—
দুই সাংবাদিক হত্যার বিচার হোক আইনেরই পথ মেনে,
রাষ্ট্র যেন সত্যের পাশে দাঁড়ায় দৃঢ় অঙ্গীকারে।

শামসুর রহমান কেনল, তোমার কলম থেমে গেছে বহুদিন,
তবু তোমার সত্যের ভাষা জাগিয়ে রাখে প্রতিদিন।
মুকুল ভাইও ঘুমিয়ে আছেন নক্ষত্রখচিত নীরব ঘোরে,
তাঁদের লেখা বাতিঘরের মতোই জ্বলে অন্তরে।

রক্ত ঝরে বৃথা যায় না—ইতিহাস তা জানে ভালো,
সত্য একদিন ফিরবেই সে ন্যায়ের দীপ জ্বালিয়ে আলো।
বিচার যতই বিলম্ব হোক, সত্য মুছে যায় না কভু,
মানুষ বাঁচে ন্যায়ের টানে, সত্যই তার শেষ প্রভু।

যে দেশে শহীদের রক্তে স্বাধীনতার সূর্য ওঠে,
সে দেশে কেন সাংবাদিক প্রাণ হারাবে সত্য বলতে?
যে দেশে কলম সম্মানের, যে দেশে মুক্ত চিন্তার গান,
সে দেশে কেন অশ্রু ঝরে বিচারহীন প্রতিক্ষণ?

এসো তবে নতুন করে শপথ নিক এই বাংলাদেশ,
সত্য বলার অধিকার আর থাকবে না কোনোদিন শেষ।
খুনির কাছে মাথা নত নয়, নয় কোনো ভয়ের জীবন,
আইনের কাছে সবাই সমান—হোক এ দেশের দৃঢ় পণ।

আজও যারা সংবাদ লেখে সীমান্ত, গ্রাম, নগর জুড়ে,
তাঁদের চোখে ভয় নয়, থাকুক ন্যায়ের আলো ভরে।
কলম যেন আর রক্তমাখা শোকের প্রতীক না-হয়,
সত্য যেন সম্মান পায়, মানুষ যেন ন্যায়ই পায়।

ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘশ্বাস আজও বাতাস বেয়ে যায়,
যশোর শহর নীরব থেকে সেই ইতিহাস বুকে গায়।
বাংলার মানুষ স্মরণ করে দুই নির্ভীক সংবাদসৈনিক,
তাঁদের প্রতি চিরশ্রদ্ধা—তাঁদের ঋণে জাতি ঋণিক।

শেষে শুধু এই প্রার্থনা—সময়ের কাছে, রাষ্ট্রের তরে,
বিচার যেন আর বিলম্বে হারিয়ে না যায় অন্ধকারে।
শামসুর রহমান কেবল, মুকুল ভাই—তোমরা আছো জাতির প্রাণ,
সত্যের পথে যারা চলে, মৃত্যুতেও হয় না অবসান।

একদিন অবশ্যই ন্যায়ের ঘণ্টা বাজবে দেশের প্রাঙ্গণে,
আইনের দীপ জ্বলবে আবার সত্যের শুভ অর্ঘ্যগানে।
সেদিন ইতিহাস বলবে গেয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে অবিরাম—
“কলম কখনো মরে না, অমর থাকে শামসুর রহমান কেবল।
সত্যের রক্ত বৃথা নয়, অমর সাইফুল আলম মুকুলের নাম।”

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ