অমিতা সেনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২৬

অমিতা সেনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

Manual1 Ad Code
  • শান্তিনিকেতনের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা

সত্য ধাম |

বাংলা সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও তাঁদের কর্ম, ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবের মাধ্যমে এক অনন্য উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। স্বনামধন্যা অমিতা সেন তাঁদেরই একজন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের মা, তবে তাঁর নিজস্ব পরিচয় আরও বিস্তৃত ও গভীর।

আজ তাঁর ১১৪তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন গুণী মাতৃমূর্তিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, রবীন্দ্রচিন্তার উত্তরাধিকার এবং বাঙালির মানবিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল অধ্যায়কে নতুন করে স্মরণ করা।

Manual7 Ad Code

অমিতা সেন ১৯১২ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্র-সহচর আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন। ভারতীয় দর্শন, লোকসংস্কৃতি ও মধ্যযুগীয় সাধকসাহিত্য নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও সমানভাবে সমাদৃত। এমন এক বিদ্যাচর্চার পরিবেশেই অমিতা সেনের শৈশব ও কৈশোর গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন হয়ে ওঠে তাঁর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মজীবনের প্রধান ক্ষেত্র।

Manual2 Ad Code

শান্তিনিকেতন কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের মানবিক শিক্ষার কেন্দ্র। এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা অমিতা সেন ছিলেন কবিগুরুর অত্যন্ত স্নেহধন্য। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য এবং মানবিক মূল্যবোধে গড়ে ওঠা তাঁর ব্যক্তিত্ব শান্তিনিকেতনের আদর্শকে গভীরভাবে ধারণ করেছিল। তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলেন না; বরং শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও সক্রিয় অংশীদার ছিলেন।

Manual4 Ad Code

রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ‘শাপমোচন’, **‘নটীর পূজা’**সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অমিতা সেন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তিনি শান্তিনিকেতনে সুপরিচিত ছিলেন। সেই সময় শান্তিনিকেতনে ‘অমিতা সেন’ নামে দুজনের বিশেষ পরিচিতি ছিল—একজন গানে, অন্যজন নাচে। নৃত্যশিল্পী অমিতা সেন ছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের কন্যা। তাঁর শিল্পীসত্তা, সৌন্দর্যবোধ এবং মঞ্চ-উপস্থিতি সে সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশেষভাবে প্রশংসিত ছিল।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যশোধরা বাগচী তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, তাঁদের বড় হয়ে ওঠার সময় শোনা যেত শান্তিনিকেতনে দুই ‘অমিতা সেন’-এর খ্যাতির কথা। একজন গানে, অন্যজন নাচে। যাঁকে তিনি ‘অমিতাপিসি’ বলে উল্লেখ করেছেন, সেই অমিতা সেনের নৃত্যনৈপুণ্য এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলোর মাধ্যমে শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল সংরক্ষিত হয়েছে।

অমিতা সেনের জীবন ছিল নিভৃত অথচ কর্মময়। শান্তিনিকেতনের আর্থিক সংকটের সময় অর্থসংগ্রহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই তথ্য নিজেই উল্লেখ করেছেন তাঁর পুত্র অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। শান্তিনিকেতনকে টিকিয়ে রাখতে এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত আদর্শকে এগিয়ে নিতে তিনি নীরবে যে অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

Manual7 Ad Code

ব্যক্তিজীবনে অমিতা সেন ছিলেন অধ্যাপক আশুতোষ সেনের সহধর্মিণী। আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এই পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠেন তাঁদের পুত্র অমর্ত্য সেন। পরবর্তীকালে অর্থনীতি, দর্শন ও জনকল্যাণমূলক চিন্তাধারায় বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারে (ব্যাংক অব সুইডেন প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল) ভূষিত হন তিনি।

অমর্ত্য সেন একাধিকবার স্বীকার করেছেন, তাঁর চিন্তাজগত, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যুক্তিবাদী মনন গঠনে পারিবারিক পরিবেশ, বিশেষ করে তাঁর মায়ের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। অমিতা সেন সন্তানকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্বই শেখাননি; বরং মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতাও গড়ে তুলেছিলেন। এ কারণেই অমর্ত্য সেনের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে মানবকল্যাণ, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং সক্ষমতা (Capability Approach)-এর মতো মৌলিক ধারণা।

অমিতা সেন নিজে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, সমাজে প্রকৃত পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মিত হয় নীরব নিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানবিক শিক্ষার মাধ্যমে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সংস্কৃতিসেবী, শিক্ষানুরাগী, সংগঠক এবং আদর্শ মা। তাঁর ব্যক্তিত্বে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের প্রতিফলন যেমন দেখা যায়, তেমনি ভারতীয় উদার মানবতাবাদেরও এক অনন্য প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

২০০৫ সালের ২২ আগস্ট তিনি পরলোকগমন করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধ, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে মানবিকতা, সহনশীলতা ও সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তখন অমিতা সেনের জীবন আমাদের সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

তাঁর জন্মস্থান মানিকগঞ্জ আজও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারে এই কৃতী কন্যাকে। একই সঙ্গে শান্তিনিকেতনও তাঁকে স্মরণ করে রবীন্দ্র-ঐতিহ্যের এক নিবেদিত উত্তরসূরি হিসেবে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মহৎ মানুষের পরিচয় কেবল তাঁর খ্যাতিতে নয়, তাঁর নীরব অবদান, মানবিক আদর্শ এবং আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করার ক্ষমতায় নিহিত।

অমিতা সেনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা এবং উদার চিন্তার পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাক। ইতিহাসের পাতায় তিনি শুধু নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের জননী নন; তিনি নিজেই ছিলেন এক স্বতন্ত্র আলোকবর্তিকা, যাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতি ও শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ