মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code
  • স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের রাজনীতিতে স্মরণীয় এক জীবন

বিশেষ প্রতিনিধি | মৌলভীবাজার, ১৮ আগস্ট ২০২৬ : একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান প্রণেতা, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসংগঠক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড মৌলভীবাজারের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’প্রাপ্ত এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন।

আজিজুর রহমান ১৯৪৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজার জেলার গুজারাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুল সত্তার এবং মাতা মরহুম কাঞ্চন বিবি। শৈশবেই শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি শ্রীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেখানে শিক্ষা অব্যাহত রাখতে পারেননি। পরবর্তীতে হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বৃন্দাবন কলেজ থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে

ছাত্রজীবন থেকেই আজিজুর রহমান সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। সেই নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে আজিজুর রহমান পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রস্তুতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

কারাবরণ থেকে মুক্তিযুদ্ধে

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর দেশজুড়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই ২৬ মার্চ আজিজুর রহমান কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল মুক্তিবাহিনী সিলেট কারাগার ভেঙে তাঁকে মুক্ত করে।

এরপর ২ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুনরায় মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করলে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে যান। সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

Manual3 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শুধু রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবেই নয়, একজন প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক-কমান্ড কাঠামোর অংশ হিসেবেও ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত সামরিক প্রশিক্ষণে সিলেট বিভাগের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে অংশ নেন। পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক কো-অর্ডিনেটর ও কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির আহ্বানে পশ্চিমবঙ্গের বাগডুগায় (দার্জিলিং) অনুষ্ঠিত প্রথম পার্লামেন্ট অধিবেশনেও তিনি অংশ নেন।

মৌলভীবাজার মুক্ত ঘোষণায় ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় আজিজুর রহমান সরাসরি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও গণপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর, ৬ ডিসেম্বর রাজনগর এবং ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের এই অধ্যায় আজিজুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বাধীনতার পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

সংবিধান প্রণয়নে অংশগ্রহণ

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় আজিজুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। গণপরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের একজন স্বাক্ষরকারী ও প্রণেতা ছিলেন তিনি।

Manual2 Ad Code

রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংবিধান প্রণয়নের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অধ্যায়।

সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা

আজিজুর রহমান পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে সংবিধানের একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখ করা হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দুই মেয়াদ এবং সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদান

রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও আজিজুর রহমানের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। মৌলভীবাজার মহিলা কলেজ—বর্তমানে সরকারি মহিলা কলেজ—এবং সৈয়দ শাহ মোস্তফা কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে তাঁর ভূমিকা স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। মানুষের দুর্দশায় পাশে দাঁড়ানোর জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মৌলভীবাজার শাখার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও আজিজুর রহমানের দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদকালে জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

রাজনৈতিক মহলে শ্রদ্ধা

আজিজুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানও তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক তাপস কুমার ঘোষ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন এবং শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদ।

স্মরণে আজিজুর রহমান

মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজিজুর রহমান এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে রাজনীতি, জনসেবা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।

Manual5 Ad Code

স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একজন রাজনীতিক হিসেবে তাঁর অবদান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ