লালমাটিয়ায় ‘হেঁটে যাই বিদ্যালয়, দেহ-মন সুস্থ রয়’ কর্মসূচির উদ্বোধন

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২৬

লালমাটিয়ায় ‘হেঁটে যাই বিদ্যালয়, দেহ-মন সুস্থ রয়’ কর্মসূচির উদ্বোধন

Manual4 Ad Code
  • নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি—শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২০ আগস্ট ২০২৬ : “অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়নের কারণে নগরজীবনে শারীরিক কার্যক্রমের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত গণপরিসরের স্বল্পতা, যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ এবং অনিরাপদ সড়কব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।”

এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে হেঁটে যাতায়াতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ ও হাঁটাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষকরা।

Manual3 Ad Code

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘হেঁটে যাই বিদ্যালয়, দেহ-মন সুস্থ রয়’ শীর্ষক কার্যক্রমের কিক-অফ মিটিংয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।

দুপুর ১টায় বিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী অংশ নেন।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা প্রমা সাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আকমল হোসেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রমে সক্রিয় নয়। বিদ্যালয়ে হেঁটে যাতায়াতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ সহজেই পূরণ করা সম্ভব।

তারা আরও বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে হাঁটাকে উৎসাহিত করা হলে শুধু শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যই ভালো থাকবে না, একই সঙ্গে ছোট দূরত্বের যাতায়াতে যান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার কমবে। এতে জ্বালানি ব্যবহার ও যানবাহননির্ভরতা কমার পাশাপাশি বায়ু ও শব্দদূষণও হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

Manual7 Ad Code

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা জরুরি। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে হেঁটে যাতায়াতের মাধ্যমেই দৈনন্দিন জীবনে এই শারীরিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ সম্পন্ন করতে পারে।

তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিরাপত্তা। ভাঙাচোরা রাস্তা, জলাবদ্ধতা, ফুটপাতের সংকট এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের হেঁটে স্কুলে পাঠাতে অনেক সময় নিরাপদ বোধ করেন না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরাও হাঁটার পরিবর্তে মোটরচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।”

শিশুদের জন্য নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গাউস পিয়ারী বলেন, বিদ্যালয়কেন্দ্রিক সড়কব্যবস্থাপনায় পথচারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে স্কুলে শিক্ষার্থীদের আগমন ও ছুটির সময় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং ফুটপাত ও হাঁটার পথ বাধামুক্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শায়লা খাতুন বলেন, এলাকার অনেক শিশু প্রতিদিন হেঁটেই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। তবে নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে তাদের প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।

তিনি বলেন, “আমাদের শিশুরা হাঁটতে চায় এবং অনেকেই হেঁটে স্কুলে আসে। কিন্তু রাস্তার অনিরাপদ পরিবেশ, যানবাহনের চাপ, জলাবদ্ধতা ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পথচলা স্বাচ্ছন্দ্যময় ও ঝুঁকিমুক্ত করতে এখনই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

Manual3 Ad Code

শায়লা খাতুন আরও বলেন, রাস্তার ধরন ও ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে কিছু সড়ক শুধু পথচারী ও অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। আবার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আগমন ও ছুটির নির্দিষ্ট সময়ে কিছু সড়কে মোটরযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ শিশুদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও আস্থা তৈরি করবে।

তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই হাঁটার অভ্যাসে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তবে শুধু শিক্ষার্থীদের হাঁটতে বললেই হবে না, তাদের হাঁটার জন্য নিরাপদ পরিবেশও তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়, অভিভাবক, এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আকমল হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হেঁটে যাতায়াতে উৎসাহিত করা হয়। হাঁটার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সক্রিয় জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে যাতায়াত ব্যয় কমে এবং পরিবেশের ওপর চাপও হ্রাস পায়।

তিনি বলেন, “আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা সুস্থ, সক্রিয় ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠুক। বিদ্যালয়ে হেঁটে আসা-যাওয়া সেই অভ্যাস তৈরির একটি সহজ উপায়। তবে হাঁটার পরিবেশ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় না হলে এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন।”

অধ্যক্ষ আরও বলেন, এলাকায় হাঁটার পরিবেশ উন্নত করতে শুধু বিদ্যালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এলাকাবাসী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরের হাঁটার পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বক্তারা বলেন, একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ শুধু তার গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়; বরং এটি তার দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রম, সামাজিক যোগাযোগ ও নগরজীবনের অভিজ্ঞতারও অংশ। নিরাপদ হাঁটার সুযোগ তৈরি করা গেলে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।

তাদের মতে, নগর পরিকল্পনায় শিশু ও পথচারীদের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি। স্কুল, আবাসিক এলাকা, বাজার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত আলো, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং যানবাহনমুক্ত বা যানবাহন-নিয়ন্ত্রিত সময় নির্ধারণ করা হলে হাঁটার পরিবেশ অনেকটাই নিরাপদ করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা ইমরান মিয়া, ডকুমেন্টেশন অফিসার মো. বাবুল মিয়া, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকাবাসীসহ অনেকে।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘হেঁটে যাই বিদ্যালয়, দেহ-মন সুস্থ রয়’ কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত হাঁটার প্রতি উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে হাঁটাবান্ধব নগর গড়ে তোলার বিষয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নগরবাসীর সুস্থতা ও পরিবেশ রক্ষায় হাঁটাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তারা বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে হাঁটা ও অযান্ত্রিক যান ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন নিরাপদ, বাধামুক্ত ও সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য পথচারীবান্ধব নগর অবকাঠামো।

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ