আমন মৌসুমে কৃষকের হাতে সার, পাটের লাভজনক মূল্য নিশ্চিতের দাবি জাতীয় কৃষক সমিতির

প্রকাশিত: ১০:৫২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২৬

আমন মৌসুমে কৃষকের হাতে সার, পাটের লাভজনক মূল্য নিশ্চিতের দাবি জাতীয় কৃষক সমিতির

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২০ আগস্ট ২০২৬ : আমন মৌসুমে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা এবং পাটচাষিদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লাভজনক মূল্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জাতীয় কৃষক সমিতি।

একই সঙ্গে সার বিতরণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পাটের বাজারে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এক যৌথ বিবৃতিতে জাতীয় কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কৃষক নেতা জ্যোতি শংকর ঝন্টু ও সাধারণ সম্পাদক কৃষক নেতা মাহমুদুল হাসান মানিক এসব দাবি জানান।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আমন মৌসুমকে কেন্দ্র করে সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারি দামে ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনছেন। কৃষকদের অভিযোগের বরাত দিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ধরনের সার প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে।

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন তোলেন, সরকার যদি দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার কথা বলে থাকে, তাহলে কৃষকেরা কেন সরকারি নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে সার পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, একদিকে ডিলারের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে একই সার খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতির দায় সরকার এড়াতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তারা।

ডিলার পর্যায়ে সার সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি

বিবৃতিতে বলা হয়, আমন বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌসুম। এ সময়ে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।

Manual4 Ad Code

সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেন, আমন মৌসুমে কৃষককে সময়মতো সার দিতে না পারলে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে ধান চাষের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সারের ঘাটতি দেখা দিলে কাঙ্ক্ষিত ফলন অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারি গুদামে সার মজুত থাকার দাবি করলেই হবে না; সেই সার প্রকৃত কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছে সরাসরি সার পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে জাতীয় কৃষক সমিতি। পাশাপাশি সার বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা মজুতদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারির আহ্বান জানানো হয়েছে।

কালোবাজারিদের শাস্তির দাবি

Manual8 Ad Code

সার নিয়ে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, মুনাফাখোর ও কালোবাজারিদের কারণে যদি কৃষকদের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হয়, তাহলে এর সরাসরি বোঝা গিয়ে পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচের ওপর।

নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় কৃষকের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে সার ও অন্যান্য উপকরণের উচ্চমূল্য, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের অনিশ্চিত বাজার—দুই দিক থেকেই কৃষক চাপের মধ্যে পড়ছেন।

তাদের মতে, সার বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম বন্ধে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

Manual3 Ad Code

ভরা মৌসুমেও পাট বিক্রি করতে পারছেন না কৃষক

সার সংকটের পাশাপাশি পাটের ন্যায্য মূল্য নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় কৃষক সমিতি। সংগঠনটির দাবি, পাটের ভরা মৌসুম চললেও অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পাট কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে পারছেন না।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে পাটচাষিরা ব্যবসায়ীদের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সিন্ডিকেটের নির্ধারিত দরেই কৃষকদের পাট বিক্রি করতে হচ্ছে এবং এতে চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, পাটের বাজারে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ, শ্রম ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য প্রতিফলিত হচ্ছে না। কৃষক যখন মাঠে পাট উৎপাদন করেন, তখন তাকে বীজ, সার, শ্রম, জমি প্রস্তুত, পরিচর্যা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর মতো বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় করতে হয়। অথচ বাজারে পাট বিক্রির সময় সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে কৃষকের লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠে আসে না।

পাটের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি

পাটচাষিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে সরাসরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, পাট ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে বাজার ব্যবস্থায় যে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পাটের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

নেতারা বলেন, পাট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। পাটের সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। পাটচাষিরা যদি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের পাট উৎপাদন, পাটশিল্প ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

তাদের মতে, পাটের বাজারে কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

জাতীয় কৃষক সমিতি বলেছে, আমন মৌসুমে সার সংকট বন্ধ এবং পাটচাষিদের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করা না হলে দেশের কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

বিবৃতিতে সংগঠনটির নেতারা বলেন, কৃষকের উৎপাদন নির্বিঘ্ন করা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে যদি ফসলের মূল্য যথাযথভাবে না বাড়ে, তাহলে কৃষকের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই রাখতে কৃষকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তারা অবিলম্বে আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও সিন্ডিকেট বন্ধ, কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পাটচাষিদের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক মোস্তফা আলমগীর রতন স্বাক্ষরিত ও গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়।

Manual6 Ad Code

সংগঠনটির নেতারা আশা প্রকাশ করেন, কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অন্যথায় সার ও পাট—দুই ক্ষেত্রেই কৃষকের চলমান সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ