সিলেট ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬
হামে শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ ও হত্যা, স্বাস্থ্যখাতের ব্যর্থতা, বিচারহীনতা নিয়ে ক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ : শিশুরা এখন নিজ পরিবার, স্বজন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও নিরাপদ নেই। শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। এমনকি হামে আক্রান্ত হয়েও শত শত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শিশুদের ভবিষ্যৎকে বড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলছে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং কাঠামোগত হত্যা’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত রামিসা-আছিয়াসহ শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রবিবার (২৪ মে ২০২৬) বিকেল ৪টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে বক্তারা এসব দাবি জানান।
‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, দেশে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এর ফলে একদিকে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু বাড়ছে, অন্যদিকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো অপরাধের শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোরীরা।
‘হামের মৃত্যু অব্যবস্থাপনার ফল’
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেলেও স্বাস্থ্যখাত থেকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট এবং শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলাকে এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা বলেন, “হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু আধুনিক সময়ে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রতিফলন। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু প্রমাণ করে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি।”
তারা আরও বলেন, গ্রামাঞ্চল ও নিম্নআয়ের মানুষের সন্তানরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে টিকাদান সেবা পৌঁছে না দেওয়া, সচেতনতার অভাব এবং হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ
মানববন্ধনে বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানান।
রামিসা-আছিয়াসহ বিভিন্ন শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তারা বলেন, এসব ঘটনা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
বক্তারা বলেন, “দেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায় কিংবা অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। এর ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
তারা শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে স্বল্পসময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান। পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদানের আহ্বানও জানানো হয়।
‘শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’
বক্তারা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শিশুরা আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, “একটি সভ্য রাষ্ট্রে শিশুদের নিরাপত্তাহীনতায় বেড়ে ওঠা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাষ্ট্র যদি শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গভীর সংকটের মুখে পড়বে।”
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা শিশু সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান। তারা স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠন এবং অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
নাগরিক সমাজের সংহতি
মানববন্ধনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, মানবাধিকারকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার বহন করেন। সেখানে ‘হামের মৃত্যু বন্ধ করো’, ‘শিশু ধর্ষকদের দ্রুত বিচার চাই’, ‘শিশু হত্যার বিচার নিশ্চিত করো’, ‘টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করো’ ইত্যাদি স্লোগান লেখা ছিল।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তারা সরকার, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভাপতিত্ব করেন
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল-মামুন চৌধুরী। তিনি দেশে রাষ্ট্রীয় অবহেলায় হামের কারণে শিশুমৃত্যু হচ্ছে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি শিশুদের ওপর সব ধরনের নৃশংসতারও প্রতিবাদ জানান।
দেশে আইন-আদালত ও সংবিধান থাকা সত্ত্বেও অপশক্তিগুলো সেসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল মামুন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এই শিক্ষক বলেন, এই পরিস্থিতি শিশুদের ভবিষ্যৎকে বড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলছে। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম মানববন্ধনটি সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, হামে যেসব শিশু মারা গেছে, সেটা কাঠামোগত হত্যা। যথাসম্ভব টিকা কেনা হলে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হতো না। অবিলম্বে তদন্ত করে এই অবহেলায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে জোর দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচার দাবি করে বলেন, এই বিচার দ্রুত শেষ হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
মিরপুর ও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু-নারী নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড এবং দেশজুড়ে হামের প্রকোপে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ। তিনি বলেন, অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় দেশে একের পর এক ধর্ষণ ও প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ বাড়ছে। যার ফলে আজ কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়।
হামে চলমান শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ আখ্যা দিয়ে প্রতিটি হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক সেল গঠনেরও আহ্বান জানান সালেহ আহমেদ।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ঢাকা মহানগরের সহসভাপতি রেনেসাঁ পারভীন বলেন, ‘আমি প্রথমে একজন নারী। তারপর একজন মা। এমন পরিস্থিতিতে নিজের কন্যাকে কোথাও নিরাপদ দেখছি না।’ দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নিরাপত্তার অভাবে সন্তানকে গৃহবন্দী রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মায়েরা। অথচ অপরাধীরা জামিন পেয়ে প্রকাশ্যে ঘুরছে। এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি জড়িতদের দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আনন্দন’-এর প্রধান সংগঠক এ কে আজাদ, ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর’-এর সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবির, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর যুগ্ম সমন্বয়ক মো. নুরুল আমিন, মাইনউদ্দিন ভূইয়া এবং ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব)-এর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আজিজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
মানববন্ধন থেকে বক্তারা কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি চালু;
দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার ও স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ;
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর;
অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা;
ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান;
শিশু সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা শিশুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সামাজিক আন্দোলন আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি