বাংলাদেশ: ইউনুস এবং ইতিহাসের উপর আক্রমণ

প্রকাশিত: ৩:২৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২৬

বাংলাদেশ: ইউনুস এবং ইতিহাসের উপর আক্রমণ

Manual5 Ad Code

এবিএম সিরাজুল হোসেন |

“বাংলাদেশ: ইউনুস এবং ইতিহাসের উপর আক্রমণ” (Bangladesh: Yunus and Assault on History) নামক একটি বই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইটি একটি রাজনৈতিক দলিল যা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম বছরের শাসনকালকে তুলে এনেছে। গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাটিক গভর্নেন্স (GCDG) দ্বারা প্রকাশিত এই ৩১২ পৃষ্ঠার বইটি ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন সৈয়দ বদরুল আহসান, জে.এম. চৌধুরী এবং এস.এম. মাসুম বিল্লাহ। বইটি অনেকগুলো বিশ্লেষণাত্মক রিপোর্টের সংকলন যা বিভিন্ন পণ্ডিতদের লেখা থেকে সংকলিত।

Manual7 Ad Code

প্রতিবেদনের মূল থিসিস হলো: ইউনুসের অ-নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতিগুলোকে ধ্বংস করছে। এটি ইউনুসের উত্থানকে একটি “মেটিকুলাসলি ডিজাইনড কনস্পিরেসি” (meticulously designed conspiracy) হিসেবে বর্ণনা করে, যা দেশকে “অ্যানার্কিস্ট এবং ফ্যাসিস্টদের খেলার মাঠ” (playground for anarchists and fascists) করে তুলেছে।

বইটির বিভিন্ন অংশের সংক্ষেপ নিম্নরূপ—

১. ভূমিকা বা প্রিফেস (Preface)

এই অংশটি সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান কর্তৃক লিখিত, যা রিপোর্টের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করে। এতে বাংলাদেশকে একটি অস্তিত্বের সংকটে বর্ণিত করা হয়েছে, যেখানে ইউনুসের অ-নির্বাচিত সরকারকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য দায়ী করা হয়েছে। ইউনুসের ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ক্ষমতা গ্রহণকে একটি “meticulously designed conspiracy” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা জামায়াত-ই-ইসলামী, বিএনপি এবং বিদেশী শক্তি (যেমন মার্কিন বাইডেন প্রশাসন এবং হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ব্যক্তি) দ্বারা পরিকল্পিত। এটি ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সাথে তুলনা করে, এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বিদেশী উপাদান দ্বারা “হাইজ্যাক” করা বলে দাবি করে। আন্দোলনের সময় সামরিক-গ্রেড ৭.৬২ মিলিমিটারের বুলেটের অব্যাখ্যাত ব্যবহারের রহস্য তুলে ধরা হয়েছে। ইউনুসের সরকারকে দেশকে “অ্যানার্কিস্ট এবং ফ্যাসিস্টদের খেলার মাঠ” করে তোলার জন্য সমালোচনা করা হয়েছে, এবং এটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে “১৯৭১-এর মতো প্রতিরোধ” গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। এই অংশ রিপোর্টের মূল থিসিস প্রতিষ্ঠা করে: ইউনুসের শাসন রাষ্ট্রের প্রতি একটি পরিকল্পিত আক্রমণ, যা প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস এবং জাতীয় পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

২. প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর আক্রমণ (Assault on Institutions)

এই অংশে ইউনুস সরকারের অধীনে বাংলাদেশের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদকে ২০২৪ সালের আগস্টে অসাংবিধানিকভাবে ভেঙে দেওয়াকে কেন্দ্র করে, এটি সংবিধান সংস্কারের পথ প্রশস্ত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT-BD) চলা বিচারকে “farcical” বা নাটকীয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা প্রতিহিংসামূলক এবং অসাংবিধানিক। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগকে নিষিদ্ধ করা, এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরানোর মতো পদক্ষেপগুলোকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস হিসেবে দেখা হয়েছে। এছাড়া, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী উপদেষ্টাদের দ্বারা সংবিধান পরিবর্তনের অভিযোগ উঠানো হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই অংশ পেশাদারদের (যেমন শিক্ষক, সাংবাদিক) উপর নির্যাতন এবং গণতান্ত্রিক অনুসারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টির উদাহরণ প্রদান করে, যা রাষ্ট্রকে বিশৃঙ্খল করে তুলেছে।

৩. সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ধ্বংস (Cultural and Historical Destruction)

Manual5 Ad Code

বইটির এই অংশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের উপর ইউনুস সরকারের আক্রমণকে ফোকাস করে। বাংলা একাডেমিতে জাহানারা ইমামের কাজ ভাঙচুর, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি-জাদুঘর ধ্বংস, এবং টাকা ও সরকারি স্থান থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরানোর ঘটনাগুলোকে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি (ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা) মুছে ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে, যা জাতীয় পরিচয়কে পরিবর্তন করছে। ধর্মীয় চরমপন্থা বৃদ্ধি এবং ইসলামীকরণের প্রবণতাকে মার্কিন “Deep State” প্রভাবের ফল বলে দাবি করা হয়েছে। এই অংশ মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা এবং সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর উদাহরণ দিয়ে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের চিত্র আঁকে।

৪. ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সামাজিক অস্থিরতা (Attacks on Religious Minorities and Social Unrest)

এই অংশে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিস্তারিত ডকুমেন্টেশন রয়েছে। GCDG-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ৪ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে ৪৫টি জেলায় ২,০০০-এর বেশি হিন্দু সম্পত্তির উপর হামলা, মন্দির ধ্বংস এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সরকার এগুলোকে উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা জামায়াত-ই-ইসলামী এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের সাথে যুক্ত। মব লিঞ্চিং, ব্লাসফেমি অভিযোগ এবং সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানোকে “rule by terror” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং কমিউনাল হারমনির অবনতির উপর আলোকপাত করে।

৫. অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের অবনতি (Economic Decline and Human Rights Violations)

Manual3 Ad Code

বইটির এই অংশ অর্থনীতির “steep and deep slide” বর্ণনা করে, যার মধ্যে ব্যাঙ্কিং বিশৃঙ্খলা, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, ব্যবসায় মোব ভায়োলেন্স এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা রয়েছে। মানবাধিকারের দিক থেকে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, অতিরিক্ত বিচারিক হত্যা (যেমন ৮৫টি কেস), প্রতিবাদকারীদের দায়মুক্তি এবং পুলিশ স্টেশনের উপর হামলার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বিদেশ নীতিতে ভুল, যেমন পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি, মার্কিন প্রভাবের ফল বলে দাবি করা হয়েছে। এটি কর্তৃত্ববাদ এবং চরমপন্থার উত্থানকে অর্থনৈতিক অবনতির সাথে যুক্ত করে।

৬. উপসংহার এবং আহ্বান (Conclusion and Call to Action)

বইটির শেষ অংশে লক্ষ্য স্পষ্ট করা হয়েছে: দেশকে “evil grip” থেকে পুনরুদ্ধার করা। এটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মতো প্রতিরোধের পুনরাবৃত্তির আহ্বান জানায়, গণতান্ত্রিক শক্তিকে একত্রিত করে লিবারেল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরে, এবং ইউনুসের শাসনকে “barbarians” এর হাত থেকে দেশ উদ্ধারের যুদ্ধ হিসেবে দেখে।

বইটির ডাউনলোড লিংক:
https://globalcdg.org/yunus-assault-history/

Manual5 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ