বাজেট ২০২৬-২৭: নতুন সরকারের জন্য বড় সুযোগ, তবে বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ: সিপিডি

প্রকাশিত: ১২:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

বাজেট ২০২৬-২৭: নতুন সরকারের জন্য বড় সুযোগ, তবে বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ: সিপিডি

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬ : প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে দেশের নতুন সরকারের জন্য একদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় সুযোগ, অন্যদিকে কার্যকর বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্থাটি বলছে, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে ঘোষিত এই বাজেটের সাফল্য মূলত নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর।

শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ সংস্থার অন্য গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।

বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রথম বাজেট

সংবাদ সম্মেলনে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। এমন এক সময়ে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চাপে রয়েছে।

তিনি বলেন, “গত প্রায় চার বছর ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা বহন করছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি পর্যাপ্ত নয় এবং রাজস্ব আহরণেও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।”

সিপিডির মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের অস্থিরতা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে, তবুও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটের দর্শনকে স্বাগত

সিপিডি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মানব উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের বিষয়ে বাজেটে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে দর্শন বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”

বাজেটের আকার নয়, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি বিশেষভাবে জোর দেয় বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। সংস্থাটি মনে করে, বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হলো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায় না।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাজেটের সাফল্য এর আকারের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে বাস্তবায়নের গুণগত মানের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রত্যাশিত সুফল পায় না।”

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট

গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী—

মোট বাজেটের আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা,

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা,

বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা,

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য: ৬.৫ শতাংশ,

জিডিপির প্রাক্কলিত আকার: ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা,

মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য: ৭.৫ শতাংশ,

বর্তমান মূল্যস্ফীতি: ৯.৪২ শতাংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনাকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল কর প্রশাসন জোরদার এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না বাড়ালে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

Manual4 Ad Code

সিপিডি মনে করে, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কেবল করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং কর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

Manual6 Ad Code

ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি।

Manual1 Ad Code

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী—

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ: ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা,

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ: ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা,

সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস: ১৫ হাজার কোটি টাকা,

বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান: ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।

সিপিডি বলছে, ব্যাংকিং খাত থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যদি সরকারি ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের পরিবর্তে সরকারের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

সিপিডির মতে, আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশের ঘরে অবস্থান করলেও সরকার আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সংস্থাটি বলছে, শুধু মুদ্রানীতি নয়, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার তদারকির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান

সিপিডির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু বার্ষিক বাজেট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

সংস্থাটি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্পনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সরকারের জন্য প্রথম বড় সুযোগ

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সিপিডি উল্লেখ করে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি নতুন সরকারের প্রথম বড় সুযোগ।

সংস্থাটির মতে, বাজেটের মাধ্যমে ঘোষিত সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের অর্থনীতি পুনরায় টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে। তবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতা হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

অর্থাৎ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব, সংস্কার সক্ষমতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরীক্ষাও বটে। সিপিডির ভাষায়, বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ