বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ম্যাক্সিম গোর্কি পরিবর্তনের বাঁকগুলো এঁকেছেন নিখুঁতভাবে

প্রকাশিত: ১:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২৬

বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ম্যাক্সিম গোর্কি পরিবর্তনের বাঁকগুলো এঁকেছেন নিখুঁতভাবে

Manual5 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

“শ্রম ও সৃজনের বীরত্বের চেয়ে গরিয়ান আর কিছু পৃথিবীতে নেই।” -ম্যাক্সিম গোর্কি

বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ম্যাক্সিম গোর্কির ৯০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা!

কিংবদন্তি এই সাহিত্যিক পরিবর্তনের বাঁকগুলো তুলে ধরেছেন নিখুঁতভাবে। মাত্র ১১ বছর বয়সে অনাথ হয়ে যান অ্যালেক্সি ম্যাক্সিসোভিচ পেশকভ। তিনি সেই বিখ্যাত রুশ লেখক, বিশ্বের কাছে ‍যিনি পরিচিত ‘ম্যাক্সিম গোর্কি’ নামে। এ নামটি ছিল তাঁর ছদ্মনাম। তবে ছদ্মনামেই তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত।

‘গোর্কি’ শব্দের অর্থ হলো ‘তিক্ত’। এই নামকরণের পেছনে কারণ অবশ্য আছে- জীবনটাই ছিল তার কাছে তেতো, বিস্বাদময়।

১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিঝনি নভগোরোদে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। প্রথমে চিরতরে হারান বাবা ম্যাক্সিম পেশকভকে। বাবার মৃত্যুর পর গোর্কির আশ্রয় হয় মামার বাড়িতে। দাদির কাছেই তিনি বেড়ে ওঠেন গল্প শুনতে শুনতে। ভর্তি হন স্থানীয় স্কুলে। মা ভারভারা পেশকভা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তাঁর চেয়ে ১০ বছরের ছোট এক অকর্মন্য ব্যক্তিকে। পরের বিয়েটা মোটেও সুখের ছিল না। এর কিছুদিন পরেই ক্ষয়রোগে মারা গেলেন মা।

মায়ের হঠাৎ মৃত্যুর পর গোর্কির ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে দাদার ওপর। দাদা আর গোর্কির দায়িত্বভার নিতে চাইলেন না। মায়ের শেষকৃত্যের কয়েকদিন পরেই গোর্কিকে ডেকে স্পষ্ট বলে দেন, ‘তোমাকে এভাবে গলায় মেডেলের মতো ঝুলিয়ে রাখব তা তো চলতে পারে না। এখানে আর তোমার জায়গা হবে না। এবার তোমার দুনিয়ার পথে-প্রান্তরে বেরুনোর সময় হয়েছে।’

দাদার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সেই শিশু বয়সেই গোর্কিকে চাকরি নিতে হয় একটি জুতার দোকানে। শহরের সদর রাস্তার ওপর এক শৌখিন জুতার দোকানের কর্মচারী হন তিনি। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। পরিশ্রমকে তিনি মনে করতেন পুরুষের অলংকার স্বরূপ। একদিন দোকানের চাকরি ছেড়ে দিলেন তিনি। সে সময় জারের আমলে যাদের নির্বাসন দেওয়া হতো, তাদের নিয়ে যাওয়া হতো জাহাজে করে। সেই জাহাজের কর্মচারীদের বাসন ধোয়ার কাজ নেন গোর্কি। ভোর ৬টা থেকে মাঝরাত অবধি কাজ। তারই ফাঁকে ফাঁকে দুই চোখ ভরে দেখতেন নদীর অপরূপ দৃশ্য। দুই পারের গ্রামের ছবি। হিসাবপত্র মিটিয়ে হাতে আট রুবল নিয়ে ফিরে এলেন নিজের শহর নিঝনি নভগোরোদে। অবশেষে প্রিয়তম দাদির মৃত্যু গোর্কিকে করে তোলে চরম শোকবিহ্বল।
মাত্র ১২ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান নিরুদ্দেশে। জীবনের এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করেন আত্মহত্যার। ১৯ বছর বয়সে নদীর তীরে গিয়ে গুলি করেন নিজের বুকে। ঘটনাচক্রে বেঁচে যান তিনি। ঘটনাটি একটু বিস্তারিত জানা যাক, বিশ্ব যখন অস্থির সময় পার করছিল, ঠিক তখন রাশিয়ায় চলছিল জারের রাজত্বকাল। দেশজুড়ে চলছিল শাসনের নামে শোষণ অত্যাচার। বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েই গোর্কি পরিচিত হলেন কার্ল মার্কসের রচনাবলির সঙ্গে। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজনীতি, দর্শন, আরো নানা বিষয়ের বই পড়তে আরম্ভ করলেন তিনি। দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিছুদিন পর একটি রুটির দোকানে কাজ পেলেন। সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর অবধি একটানা কাজ করতে হতো তাকে। তারই ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন, বই পড়তেন।

বাস্তব জীবনের পরতে পরতে তিনি কষ্টকে, পরিশ্রমকে বন্ধুর মতোই দেখেছেন নিত্যসঙ্গী হিসেবেই। তাঁর এই সময়কার জীবনে অভিজ্ঞতার কাহিনী অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প ‘ছাবিবশজন লোক আর একটি রুটি’। সেই রুটির কারখানায় কাজ করার সময় পুলিশের দৃষ্টি পড়েছিল তাঁর ওপর। সুকৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতেন গোর্কি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে করতে মনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তার ওপর যখন সন্দেহ-অবিশ্বাস; নিজের ওপরেই সব বিশ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলতেন। মনে হতো এই জীবন মূল্যহীন, বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। এই মনে করেই তিনি বাজার থেকে কিনলেন একটি পিস্তল। ১৮৮৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর নদীর তীরে গিয়ে নিজের বুকে গুলি করলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জীবনের আশা ত্যাগ করলেও অদম্য প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে যান গোর্কি।

এদিকে এক বৃদ্ধ বিপ্লবী মাঝেমধ্যে আসতেন সেই রুটির কারখানায়। সুস্থ হয়ে উঠতেই গোর্কিকে তিনি নিয়ে গেলেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। ঘুরতে ঘুরতে এলেন নিজের ক্যাসপিয়ান সাগরের তীরে এক ছোট্ট শহরে। কোথাও বেশিদিন থাকতে মন চায় না। রেলে পাহারাদারির কাজ নিয়ে এলেন নিজের পুরোনো শহর নিঝনি নভগোরোদে। এই সময়ে কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন গোর্কি। নাম দেন ‘পুরোনো ওকের গান’। দুজন বিপ্লবীর সঙ্গে পরিচয় ছিল তাঁর। সে জন্য পুলিশ তাঁকে বন্দি করল। কিন্তু যথাযথ প্রমাণের অভাবে কিছুদিন পর ছেড়ে দিল তাঁকে। প্রায় দুই বছর সেখানে রয়ে গেলেন তিনি।

ফিরে যাই, সেই শৈশবে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পাঁচ বছর তিনি পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেন রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গা। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। এ সময় বিভিন্ন চাকরির অভিজ্ঞতা ও নানা ঘটনার স্মৃতি তাঁর পরবর্তী সময়ের লেখালেখিতে প্রভাব ফেলে। জীবনে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার অধিকারী গোর্কি চাকরি করতে গিয়ে কখনো হয়েছেন প্রহৃত, লাঞ্ছিত। অনেক সময় খাবারও জুটত না তার। এ তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই এমন ছদ্মনাম রাখা।

আগেই বলেছি, ম্যাক্সিম গোর্কির ছিল বই পড়ার প্রচুর নেশা। রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজনীতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল বেশ। একদিন হাতে এল রুশ কবি পুশকিনের একটি কবিতার বই। একনিষ্ঠভাবে পড়লেন সেটি। পড়তে পড়তে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় একাধিকবার। কাটাতে হয় নির্বাসিত জীবনও। সেই গোর্কির সঙ্গে ১৯০২ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, যার ছদ্মনাম লেনিন, তার সঙ্গে গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত সখ্য।

আক্ষরিক অর্থে গোর্কি ছিলেন তাঁর নামের মতোই তিক্ত। তাঁর লেখায় সব সময় ফুটে উঠেছে তিক্ত সত্য। রাশিয়ার জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে সঞ্চিত রাগের প্রকাশ দেখা যায় তাঁর লেখায়। গোর্কির প্রথম বই ‘এসেস অ্যান্ড স্টোরিস’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে। প্রথম বইটি সাড়া জাগিয়েছে সারা দেশে। লেখক হিসেবে ম্যাক্সিম গোর্কির জয়যাত্রা শুরু হয়। রাশিয়ার সমাজের নিচু স্তরের মানুষগুলোর জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন তিনি। রাশিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বাঁকগুলো তিনি এঁকেছেন নিখুঁতভাবে।

শ্রমিকদের সঙ্গে গোর্কির ছিল ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক। ১৯০২ সাল থেকে গোর্কি ছিলেন লেনিনের ঘনিষ্ঠতমদের একজন। ১৯০০ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত গোর্কির লেখায় আশাবাদের ব্যঞ্জনা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ১৯০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান তিনি। সেখানে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’। ১৯০৬ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত গোর্কি ছিলেন ক্যাপ্রিতে। ১৯১৩ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি আবার ফিরে আসেন রাশিয়ায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গোর্কির ঘরটি হয়ে উঠেছিল বলশেভিকদের অফিসঘর। রুশ বিপ্লবের পর গোর্কি ছিলেন ইতালিতে। ১৯৩২ সালে স্টালিনের আহ্বানে গোর্কি রাশিয়ায় ফিরে আসেন। তাকে ভূষিত করা হয় অর্ডার অব লেনিন উপাধিতে।

‘মা’ উপন্যাসের জন্য গোর্কি জগদ্বিখ্যাত। যদিও মা ছেলের সম্পর্কই উপন্যাসটির মূল বিষয়। একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য তৈরি হতে থাকা রাশিয়ার রাজনীতির পরিস্থিতি বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করার কারণে এই ঔপন্যাসিক বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ স্থান ও প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন, যা তিনি ন্যায্যভাবেই পেয়েছেন। ‘মা’ উপন্যাসটির সামাজিক মূল্য এককথায় তুলনাহীন। একটি উপন্যাস একটি জাতির বিবেককে বদলে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। পেলাগেয়া নিলভনা নামের একজন অতি সাধারণ ‘মেয়ে মানুষ’ কী করে সময়ের প্রয়োজনে আস্তে আস্তে রূপান্তরিত হন একজন রাজনীতিসচেতন ‘ব্যক্তি’তে; বুঝতে শেখেন সারা জীবন কী করুণভাবে কাটিয়েছেন, হয়েছেন শ্রেণিগত নির্যাতন ও লিঙ্গগত অবস্থানের অসহায় শিকার- সেসবের চমৎকার বর্ণনা করেছেন গোর্কি, দুর্দান্ত ছিল তাঁর ভাষারীতি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘সোশ্যাল রিয়েলিজম’ নামে যে সাহিত্যিক ধারার সূচনা হয়েছিল সেটার প্রতিষ্ঠাতা গোর্কি। তুচ্ছের মধ্যেই নাকি বৃহৎ কিছু খুঁজে নিতে হয়। আর সে কারণে বোধহয় কোনো বিষয়-বস্তুকেই কখনোই তিনি অবহেলা বা তুচ্ছের চোখে দেখেননি। উনিশ শতকে বিশ্বসাহিত্যে যে কয়েকজন হাতেগোনা সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে ঝড় তুলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যদিও তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন, তারপরও তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো তাঁকে সত্যিকারের গোর্কি হয়ে উঠতে অসামান্য অবদান রেখেছে।

সমকালীন বাস্তবতা, সমাজের নিচুতলার মানুষই ছিল তাঁর গল্পের উপজীব্য বিষয়। মূলত প্রথম দিকে তিনি লিখতেন প্রথাগত নিয়মে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ লেখক ভ্লাদিমির করোলেঙ্কার। করোলেঙ্কার কথায় চেতনা ফিরে পেলেন গোর্কি। প্রথাগত চেতনার ধারাকে বাদ দিয়ে শুরু হলো তাঁর নতুন পথের যাত্রা। সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষেরা- চোর, লম্পট, ভবঘুরে, মাতাল, বেশ্যা, চাষি, মজুর, জেলে, সারিবদ্ধভাবে প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর রচনায়। এই পর্বের কয়েকটি বিখ্যাত গল্প হলো মালভা, বুড়ো ইজরেগিল, চেলকাশ, একটি মানুষের জন্ম। গল্পগুলোতে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে নিচুতলার মানুষের প্রতি গভীর মমতা, অন্যদিকে অসাধারণ বর্ণনা, কল্পনা আর তাঁর সৃজনশক্তি।

এসব লেখার বেশির ভাগই ছাপা হয়েছিল ভলগা তীরের আঞ্চলিক পত্রিকায়। স্থানীয় মানুষ, কিছু লেখক, সমালোচক তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হলেন। তখনো যশখ্যাতি পাননি গোর্কি। ১৮৯৮ সালে তাঁর প্রবন্ধ ও গল্প নিয়ে একটি ছোট সংকলন প্রকাশিত হলো। এই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল গোর্কির নাম। এর পেছনেও আছে একটি গল্প। আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর কুলঝানি নামে এক ভদ্রলোক গোর্কিকে নিয়ে গেলেন স্থানীয় পত্রিকা অফিসে। নিজের নাম সই করার সময় ‘আলেক্সি পেশকভ’-এর পরিবর্তে লেখালেন ম্যাক্সিম গোর্কি। গল্পটি প্রকাশিত হলো ১৮৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এই গল্পে বাস্তবতার চেয়ে রোমান্টিকতার প্রভাবই ছিল বেশি। ‘এমিলিয়ান পিলিইয়াই’ গল্প পড়ে জ্যেষ্ঠ সাহিত্যিক ভ্লাদিমির গালাক্কিওনচিভচ করলিয়েনক উৎসাহ দেওয়ার পর ‘চেলকাশ’ গল্প যখন কাগজে বেরুল, তখন গোর্কিকে তিনি প্রস্তাব দেন সাংবাদিকতার চাকরির। সামারার একটি বড় কাগজে চাকরি, মাস গেলে ১০০ রুবল আসবে। গোর্কিও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন।

১৮৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শনিবারের কথা। তিফলিস শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘ককেশাস’-এ ছাপা হলো একটি গল্প : মাকার চুদ্রা। লেখকের নাম এম গোর্কি। এরপর অনেক পত্রিকায় ক্রমে ক্রমে ছাপা হতে থাকে লেখা– যেমন ভোলগা সংবাদপত্র, দৈনিক সামারা, ওদেসা সংবাদ, নিঝেগরোদপত্র ইত্যাদি। ১৯১৫ সালে তিনি নিজেই লিয়েতপিস (কড়চা) পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ১৯২১ থেকে তাঁর সম্পাদনায় বেরুনো শুরু হয় পত্রিকাটি।

গোর্কির রচনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গেয়র্গি লুকাস বলেন, ‘লেখক হিসেবে গোর্কি সর্বদাই তাঁর সমকালীন ঘটনাবলির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং নিজের রচনার মধ্যে এমন ভেদরেখা টেনে দেননি যাতে কতটুকু একজন সাহিত্যিকের লেখা আর কতটুকু একজন বিপ্লবী সাংবাদিক ও প্রচারকর্মীর লেখা, তা ধরা যায়। সত্য এর বিপরীতটাই। তাঁর মহত্তম সাহিত্যকীর্তি সর্বদা সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে উত্থিত হয়েছে।’

বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ম্যাক্সিম গোর্কিকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“ম্যাক্সিম গোর্কি”

Manual1 Ad Code

আজও ভলগার বাতাস বয়ে আনে এক নাম,
আজও শ্রমের কপাল জ্বলে সেই অগ্নিধাম,
আজও ক্ষুধার ইতিহাসে রক্তমাখা অক্ষর,
আজও মানুষের পাশে দাঁড়ায় এক মহাকালজয়ী স্বর।

তিনি গোর্কি—তিক্ত নামে বিশ্বজোড়া দীপ,
দুঃখের ভেতর গড়েছেন তিনি সংগ্রামের নীপ,
জীবন যখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে বারংবার,
তখন তিনি লিখে গেছেন মানুষেরই অধিকার।

নিঝনি নভগোরোদের আকাশ ছিল নীল,
শৈশব তার ভেঙে দিল নিয়তির নির্মম শীল,
বাবা গেলেন অকালপথে, মা-ও হারালেন প্রাণ,
শিশু চোখে জমল তখন শোকের কালো গান।

দাদির মুখের গল্প ছিল প্রথম আলোর রেশ,
লোককথার নদী বেয়ে জেগে উঠল দেশ,
রূপকথার পাখা মেলে শুনতেন কত রাত,
সেই কথারা পরে হলো সাহিত্যসম প্রভাত।

কিন্তু সুখের পথ তো ছিল না তার জন্যে,
ক্ষুধা এসে দাঁড়াল নিত্য জীবনেরই ধন্যে,
দাদার ঘরও হারাল শেষে, খুলল অনন্ত পথ,
একটি শিশুর কাঁধে তখন পৃথিবীরই রথ।

জুতার দোকান, ধূলিমাখা শ্রমের দীর্ঘ দিন,
ঘামের ভেতর খুঁজে নিতেন বাঁচার ক্ষুদ্র ঋণ,
মানুষ দেখার শিক্ষা পেলেন মানুষেরই মাঝে,
সত্য তখন শাণিত হলো দুঃখের গোপন সাজে।

জাহাজভরা নির্বাসিতের কান্নাভেজা দল,
বাসন ধোয়ার ফাঁকে ফাঁকে দেখতেন নদীর জল,
দুই তীর জুড়ে গ্রামঘেরা অনাহারের ছবি,
সেইসব মুখ পরে হলো তাঁর অমর কবি।

ক্ষুধা তাঁকে মেরেছে কত, মেরেছে অপমান,
তবু তিনি হারাননি তো স্বপ্ন দেখার জ্ঞান,
রুটির ঘরে রাত জেগে যে মানুষ খুঁজে বই,
সেই যুবকের বুকের ভেতর জেগেছিল এক স্রোতস্বিনী সই।

ইতিহাস আর অর্থনীতি, দর্শনেরই পথ,
শোষণের সব অন্ধকারে খুঁজে ফেরেন রথ,
কার্ল মার্কসের চিন্তাধারা খুলে দিল দ্বার,
মানুষ কেন বঞ্চিত হয়—জাগল প্রশ্নভার।

সন্দেহ, ক্ষুধা, ক্লান্তি, দহন, দীর্ঘ অবসাদ,
কখনো যেন জীবনটাকে মনে হয়েছে ফাঁদ,
একদিন তিনি বুকে তুলে নিলেন মৃত্যুবাণ,
তবু জীবন হার মানেনি, জিতল প্রাণের গান।

রক্তমাখা সেই বিকেলে নদীর নীরব তীর,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থেকেও হলেন আরও ধীর,
ফিরে এলেন আগুন নিয়ে নতুন জীবনের ডাক,
পৃথিবীকে বদলাবারই নিলেন গোপন শপথ।

তারপর তিনি হাঁটলেন শুধু রাশিয়ারই পথে,
মাঠে ঘাটে, বন্দরে আর জনশূন্য প্রান্তরেতে,
চাষার মুখে, মজুরের ঘামে, জেলের জালে ধরা,
একটি দেশের লুকানো সব ইতিহাস হলো ধরা।

ভবঘুরেদের নিঃসঙ্গতা, বেশ্যার চোখের জল,
চোরের বুকে জমে থাকা বঞ্চনারই ছল,
মাতালেরও হারানো স্বপ্ন, শ্রমিকের দীর্ঘ ক্ষত,
সবাই পেল আশ্রয় এসে তাঁর সাহিত্যের রথ।

তিনি দেখেন নিচুতলার মানুষেরই মুখ,
সেখানে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর অসুখ,
সেখানে আছে অমর আশা, অদম্য জেগে থাকা,
সেখানে আছে ভোরের আগে দীর্ঘ অন্ধকার ঢাকা।

“মাকার চুদ্রা” প্রথম যখন ছাপা হলো কাগজে,
নতুন একটি নাম উঠল সাহিত্যলোকের মাঝে,
পেশকভ নয়—গোর্কি তখন ইতিহাসের পথে,
তিক্ত নামের ভেতর জ্বলে বিদ্রোহী আলোকরথে।

চেলকাশ আসে, মালভা আসে, ইজরেগিলের গান,
মানুষ হয়ে ওঠে সেখানে সাহিত্যের প্রাণ,
রোমান্টিকতা মিশে গিয়ে বাস্তবতার স্রোত,
নতুন যুগের দুয়ার খুলে দিল তারই রথ।

প্রথম বই ছড়িয়ে দিল চারদিকে আলো,
পাঠকেরা চিনল তখন সত্যের মুখখানি ভালো,
রাজপ্রাসাদের গৌরব নয়, নয় অভিজাত রূপ,
মানুষ ছিল তাঁর সাহিত্যের চিরসবুজ ধূপ।

লেনিন এলেন জীবনে এক ইতিহাসের বাঁকে,
বিপ্লব তখন উথালপাথাল রক্তজাগা ডাকে,
শ্রমিক, কৃষক, নিপীড়িত জন একসূত্রে বাঁধা,
গোর্কিরও কলম তখন সংগ্রামেরই সাধা।

Manual7 Ad Code

তিনি জানেন—শব্দ শুধু অলংকারের ফুল নয়,
মানুষ জাগার প্রেরণাও সাহিত্যের মূলময়,
তাই তাঁর সব বাক্যজুড়ে জ্বলে অগ্নিস্বর,
তাই তাঁর রচনায় বাজে মুক্তিরই অন্তর।

তারপর এল “মা” উপন্যাস—সময়ের মহাগান,
একটি মায়ের চোখে দেখা ইতিহাসের মান,
পেলাগেয়া নিলভনা আর পাভেলের পথচলা,
অন্ধ গৃহের অন্তরালে জাগল যুগের জ্বালা।

একজন সাধারণ নারী বুঝল আপন ক্ষয়,
বুঝল কত নিঃশব্দ শোষণ তাকে করেছে ক্ষয়,
নিজের বুকে খুঁজে পেল মানুষেরই স্থান,
মায়ের ভেতর জেগে উঠল বিপ্লবী সম্মান।

“মা” কেবল এক উপন্যাস নয় তো কোনোদিন,
একটি জাতির আত্মজাগা সংগ্রামী সংগীন,
শৃঙ্খলভাঙা মানুষেরই মহাকাব্যিক ডাক,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবারই হাক।

ক্যাপ্রির নীল সাগরতীরে নির্বাসিত দিনরাত্রি,
তবু তাঁর মন পড়ে থাকে শ্রমিকপল্লির মাত্রই,
দেশ থেকে দূরে থেকেও দেশকে রাখেন বুকে,
মানুষেরই মুক্তিস্বপ্ন লিখে যান সুখে-দুঃখে।

যুদ্ধ নামে পৃথিবীতে, কেঁপে ওঠে ধরণী,
রক্তস্রোতে ডুবে যেতে থাকে মানবগণনী,
তাঁর ঘর তখন বিপ্লবীদের কর্মচঞ্চল স্থান,
ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে জেগে থাকে প্রাণ।

সোশ্যাল রিয়েলিজম নামে যে ধারার উন্মেষ,
তারই শিখর ছুঁয়ে আছেন তিনি অবশেষ,
বাস্তবতাকে দেখার চোখ শিখিয়েছেন যিনি,
সাহিত্যেরও সামাজিক দায় বুঝিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন—শ্রমের চেয়ে গরীয়ান আর কী,
সৃষ্টি আর পরিশ্রমেই মানুষের জয় দেখি,
যে হাত মাটি খুঁড়ে আনে আগামী দিনের ধান,
সেই হাতে লুকিয়ে থাকে সভ্যতার সম্মান।

Manual8 Ad Code

তাই তাঁর সব চরিত্র যেন আমাদেরই লোক,
আমাদেরই গ্রামশহরের কান্না-হাসির শোক,
রাশিয়ার পথ পেরিয়ে তারা বিশ্বজুড়ে যায়,
মানুষেরই ভাষা বলে, মানুষকেই চায়।

যক্ষ্মা এসে কাঁপিয়ে দিল জীবনেরই শাখ,
তবু কলম থামেনি তাঁর, জ্বলেছে অনির্বাক,
জার্মানির পথ, ক্যাপ্রির নীল, সোরেন্তোর দিন,
রোগের ভেতর লিখে গেছেন মানুষের ঋণ।

স্টালিন ডাকে, ফিরে এলেন আপন জন্মভূমে,
ইতিহাসের জটিল স্রোতে, বিতর্কেরও ঘূর্ণিতে,
তবু তাঁর নাম উচ্চারিত শ্রমেরই সম্মানে,
মানুষ খোঁজার দুর্মর তৃষ্ণা ছিল প্রাণের টানে।

শেষ বিকেলের ক্লান্ত আলো, মস্কোর নীরব ঘর,
জীবন যেন থামতে চায় অজস্র স্মৃতিভর,
মৃত্যুর আগে উচ্চারিত সতর্ক বাণী সেই—
“যুদ্ধ আসছে, প্রস্তুত থেকো”—আজও বাজে তাই।

আজ নব্বই বছরেরও বেশি সময়ের পর,
তবু তাঁরই লেখা জাগায় অবিনাশী অন্তর,
যেখানে ক্ষুধা, যেখানে শোষণ, যেখানে অমানিশা,
সেখানে গোর্কি জ্বালেন এসে প্রতিরোধের দিশা।

যতদিন শ্রমিকের ঘামে ভিজবে পৃথিবীখানি,
যতদিন বঞ্চিত মানুষ খুঁজবে আপন বাণী,
যতদিন সত্য উচ্চারণ হবে বিপদসংকুল,
ততদিন গোর্কি থাকবেন অমর অক্ষয় মূল।

ভলগা নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে তাঁর স্মৃতির পাল,
শ্রমের গানে, সংগ্রামে আর মুক্তির রক্তজাল,
তিক্ত নামে জন্ম নিয়ে মধুর আলোকরেখা,
মানবতার মহাপথে রেখে গেছেন লেখা।

হে গোর্কি, তোমার প্রতি আমাদের প্রণাম,
শব্দে শব্দে জেগে থাকুক তোমার অগ্নিধাম,
দুঃখের ভেতর মানুষ খোঁজার যে মহান শিক্ষা,
সেই আলোয় উদ্ভাসিত হোক আগামী ইতিহাসিকা।

তোমার কলম আজও যেন মিছিলেরই শঙ্খ,
আজও যেন শ্রমিকহাতে জ্বলে তারই অঙ্ক,
আজও যেন নিপীড়িতের হৃদয়জুড়ে রয়,
মানুষের জয়গান গেয়ে অমর তোমার জয়।
—(ম্যাক্সিম গোর্কি,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

১৯২১ সালে হঠাৎই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন ম্যাক্সিম গোর্কি। উন্নত চিকিৎসার জন্য লেনিন তাঁকে পাঠান জার্মানিতে। দুই বছর সেখানে কাটিয়ে ১৯২৪ সালের এপ্রিলের প্রথমে গেলেন তাঁর প্রিয় জায়গা ক্যাপ্রিতে, পরে সেখান থেকে সোরেন্তো ফেরেন, ১৯২৮ সালে। তখনো তিনি ভালোমতো সেরে ওঠেননি। চিকিৎসারত অবস্থায় ৬৮ বছর বয়সে ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন রাশিয়ার মস্কোতে আকস্মিকভাবে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন কালজয়ী এই সাহিত্যিক। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ আসছে … তোমরা তৈরি থেকো।’

Manual2 Ad Code

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ