সিলেট ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:২১ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম), ২৩ জুন ২০২৬ : জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত ন্যূনতম মজুরির চূড়ান্ত গেজেট অবিলম্বে প্রকাশ, সকল শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, আইনানুগ সবেতন ছুটি নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শ্রমিক নেতারা বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকরা এখনও ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) সীতাকুণ্ড উপজেলার বার আউলিয়া এলাকায় জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর সহযোগিতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে জাহাজভাঙা শিল্পের বিভিন্ন ইয়ার্ডের শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং শ্রম অধিকারকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধন—সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য ও জাহাজভাঙা শিল্পের ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি মো. আলি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফোরামের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু। সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ মেটাল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিএমএসএফ) যুগ্ম সম্পাদক মো. ইদ্রিস এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মানিক মণ্ডলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
‘চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশে বিলম্বে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত’
বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পর গত ৭ জানুয়ারি ২০২৬ জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরির খসড়া গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রায় ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনও চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। এর ফলে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হচ্ছে না এবং শ্রমিকরা ঘোষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
তারা অভিযোগ করেন, গেজেট প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শ্রমিক অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।
শ্রমিক নেতারা বলেন, দেশের জাহাজভাঙা শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ইস্পাত উৎপাদন এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অথচ এ শিল্পের শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের মধ্যে রয়েছেন এবং তাদের মৌলিক শ্রম অধিকারও নিশ্চিত হয়নি।
নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র না থাকায় অধিকার বঞ্চনা
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, অধিকাংশ জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে শ্রমিকদের লিখিত নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয় না। ফলে চাকরির স্থায়িত্ব, মজুরি, ছুটি, ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগপত্র না থাকায় দুর্ঘটনা বা চাকরি হারানোর ঘটনায় শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে পরিচয়পত্রের অভাবে শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মরত কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়।
নেতারা বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে তা মানা হচ্ছে না। এ বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির দাবি জানান তারা।
সবেতন ছুটি বাস্তবায়নের দাবি
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, আইনানুগ সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং অন্যান্য সবেতন ছুটির বিধান অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকরা বিশ্রাম ও পারিবারিক জীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তারা বলেন, শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদা এবং কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে আইনে নির্ধারিত সব ধরনের ছুটি নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রম আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে অতিরিক্ত কাজ আদায় করে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
জাহাজভাঙা শিল্পকে দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর অভাবে শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মালিকপক্ষ, সরকারি সংস্থা এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা কোনোভাবেই উৎপাদন ব্যয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে না। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব।
বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
অনুষ্ঠিত মানববন্ধন সমাবেশে থেকে শ্রমিক নেতারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তারা অবিলম্বে জাহাজভাঙা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ, সকল শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, আইনানুগ সবেতন ছুটি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মৌলিক শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পখাতের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে শ্রমিকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর।
এক প্রতিক্রিয়ায় কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের সংহতি প্রকাশ
এদিকে জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবিগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা জাহাজভাঙা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত ন্যূনতম মজুরির চূড়ান্ত গেজেট দ্রুত প্রকাশ, নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, আইনানুগ ছুটি বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হলে শিল্পে স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
তিনি আরও বলেন, টেকসই শিল্প উন্নয়ন এবং মানবিক কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে জাহাজভাঙা শিল্পে আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়ন জরুরি। শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি