বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বড় ব্যবধান রয়েছে: বিলস

প্রকাশিত: ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২৬

বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বড় ব্যবধান রয়েছে: বিলস

Manual3 Ad Code
  • বাজেট পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রমিকবান্ধব বরাদ্দ নিশ্চিতে ১৫ দফা সুপারিশ বিলসের

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৬ জুন ২০২৬ : জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)।

শ্রমিকদের পক্ষে জাতীয় পর্যায়ের নানা মতাদর্শের ট্রেড ইউনিয়ন ভিত্তিক ২৪টা জাতীয় ফেডারেশনের সমন্বয়ে গঠিত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই সংগঠনটির মতে, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বাজেট প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় দেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষিত হওয়ায় শ্রমক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদা ও সংকটের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।

শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত “জাতীয় বাজেটে শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা: বাজেট ২০২৬-২৭ এর পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা” শীর্ষক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)।

শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট সম্ভব নয়

বিলসের ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে সূচনা বক্তব্য দেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট শুধু রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সামাজিক অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জাতীয় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

বাজেটে ইতিবাচক দিক থাকলেও রয়েছে বড় ঘাটতি

অনুষ্ঠানে বাজেটের পর্যালোচনা ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন বিলসের গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হবে না; বরং এসব অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে সেবার বাস্তব পৌঁছানো জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে শ্রমবাজারে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অটোমেশন, অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কর্মসংস্থানের সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপ শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল, যা পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

বিলসের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের সম্প্রসারণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়ে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।

শ্রমিকবান্ধব বাজেট নিশ্চিতে ১৫ দফা দাবি

প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রমিকবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট নিশ্চিত করতে বিলস ১৫ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে। এসব দাবির মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়।

Manual2 Ad Code

বাজেট পর্যালোচনায় বিলসের বক্তব্যে বলা হয়, বাজেট প্রণয়নে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

সংগঠনটি শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (টিন) নম্বরের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। তাদের মতে, নিম্নআয়ের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এই শর্ত পূরণ করতে না পারায় ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের সব শ্রমিকের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বেকার, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য ‘শ্রমিক কার্ড’ চালুর দাবি জানানো হয়, যাতে সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আহ্বান

Manual2 Ad Code

বিলসের মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমিক কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। এজন্য বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃদক্ষতা অর্জন (Reskilling) এবং নতুন দক্ষতা অর্জন (Upskilling) কর্মসূচিতে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষা ও পেনশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের দাবি

প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, দেশের অধিকাংশ শ্রমিক বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকরা এখনো কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নেই। ফলে কর্মক্ষমতা হারানো, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা কর্মহীনতার সময় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

এই প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে সকল শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ও সুযোগ বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়।

শিল্পাঞ্চলে রেশন, চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধার প্রস্তাব

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ন্যায্যমূল্যে রেশন শপ চালুর দাবি জানায় বিলস। সংগঠনটির মতে, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং নারী শ্রমিকদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে ডরমিটরি নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

Manual5 Ad Code

বক্তারা বলেন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা এখন সময়ের দাবি।

বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের সুপারিশ

Manual3 Ad Code

বিলসের পক্ষ থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালুর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য

সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য দেন শ্রমিক অধিকার এডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম সমন্বয়কারী এএএম ফয়েজ হোসেন এবং শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের প্রতিনিধি রাজিব আহমেদসহ অন্যান্য শ্রমিকনেতারা।

তারা বলেন, জাতীয় বাজেটে শ্রমিকদের অবদান ও প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল। শ্রমিক কল্যাণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শ্রমিকবান্ধব অর্থনীতি গঠনে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান

ব্রিফিংয়ের সমাপনী বক্তব্যে বিলস উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মেসবাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে জাতীয় বাজেটকে অবশ্যই শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পেছনে শ্রমজীবী মানুষের অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ও প্রয়োজন যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।”

বিলসের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতি শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় বাজেট সত্যিকার অর্থেই একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ