ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ৪১ ওয়ার্ডে নেই পার্ক ও খেলার মাঠ

প্রকাশিত: ৪:১১ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২৬

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ৪১ ওয়ার্ডে নেই পার্ক ও খেলার মাঠ

Manual6 Ad Code
  • মাঠ-পার্ক ব্যবস্থাপনায় এলাকাবাসীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিতের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ৩০ জুন ২০২৬ : রাজধানী ঢাকার দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় সবুজ ও উন্মুক্ত পরিসরের ঘাটতি যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদ্যমান মাঠ ও পার্কের অনেকগুলো দখল, বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশবিদ, নগর উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

Manual1 Ad Code

মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) সকাল ১০টায় রাজধানীর ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকার পার্ক ও খেলার মাঠ : নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট।

সভায় জানানো হয়, ঢাকার মোট ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডে কোনো পার্ক ও খেলার মাঠ নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোর, তরুণ, নারী ও প্রবীণ নাগরিক স্বাস্থ্যসম্মত বিনোদন ও শারীরিক চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুনের সঞ্চালনায় এবং সংস্থাটির পরিচালক গাউস পিয়ারীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় বক্তব্য দেন বারসিকের অ্যাগ্রো-বায়োডাইভার্সিটি, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, পরিবেশবাদী ছাত্র-যুব সংগঠন গ্রীন ভয়েসের সংগঠক ও সহ-সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির ইবনুল সাঈদ রানা এবং তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও উন্নয়নকর্মী সৈয়দা রত্না।

মাঠ-পার্কের সংখ্যা অপ্রতুল, দরকার পুনরুদ্ধার উদ্যোগ

Manual5 Ad Code

মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নগরবাসীর প্রয়োজনের তুলনায় রাজধানীতে মাঠ ও পার্কের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বিদ্যমান উন্মুক্ত স্থানগুলোর একটি অংশ বিভিন্ন সময় দখল, ভরাট কিংবা অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “দখলকৃত মাঠ-পার্ক পুনরুদ্ধার এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) গণপরিসর হিসেবে চিহ্নিত স্থানগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনাকে একটি নির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, মাঠ ও পার্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল ও জটিল নকশার পরিবর্তে দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে উন্নয়ন ব্যয় কমবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে।

উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে মাঠ-পার্ক

গ্রীন ভয়েসের সংগঠক হুমায়ুন কবির সুমন অভিযোগ করেন, রাজধানীর বিভিন্ন মাঠ ও পার্ক উন্নয়নের নামে দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে সেগুলো চালু হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, ক্লাব বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

তিনি বলেন, “অনেক মাঠে অর্থের বিনিময়ে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া হলেও সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশে নানা বাধা সৃষ্টি করা হয়। ফলে জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত স্থান জনগণের জন্যই অপ্রবেশযোগ্য হয়ে পড়ে।”

Manual3 Ad Code

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চলতি বছরের শুরুতে হাইকোর্ট ঢাকা শহরের সব মাঠ ও পার্কের তালিকা প্রণয়ন, বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সর্বসাধারণের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করবে।

আইনের বাস্তবায়নে ঘাটতির কারণে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রতিনিধি ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, দেশে মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য শক্তিশালী আইন থাকলেও বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, “বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা গণপরিসরের সুবিধা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। তাই মাঠ ও পার্কের বর্তমান নকশা ও ব্যবহার ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।”

এ জন্য তিনি একটি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা নিয়মিতভাবে মাঠ ও পার্কের অবস্থা মূল্যায়ন করে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।

স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সৈয়দা রত্না বলেন, মাঠ ও পার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ না থাকায় তাদের প্রকৃত চাহিদা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

তার ভাষ্য, “সকল বয়স, লিঙ্গ ও সক্ষমতার মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে মাঠ ও পার্কের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।”

তিনি মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনায় এলাকাভিত্তিক নাগরিক কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব দেন, যাতে স্থানীয় জনগণ রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির কাজে সরাসরি যুক্ত হতে পারেন।

অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গঠনের আহ্বান

সভাপতির বক্তব্যে ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয়তা পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। এর ফলে নগরবাসীর একটি বড় অংশ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খেলার জায়গা নিশ্চিত করতে পারছি না। বরং অনেক ক্ষেত্রে মাঠগুলো বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হচ্ছে। একইভাবে প্রবীণরাও উন্মুক্ত পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ না পেয়ে ঘরবন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, একটি বাসযোগ্য, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শহর গড়ে তুলতে হলে মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানকে নগর অবকাঠামোর অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

Manual3 Ad Code

নাগরিক প্রত্যাশা

সভায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—ঢাকার সব ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত মাঠ ও পার্ক নিশ্চিত করা, দখলকৃত উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার, মাঠ ও পার্কে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত করা, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা, নারীদের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং মাঠ-পার্ক ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ বার্তার সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এম এ মান্নান মনির, ধানমন্ডি কচিকণ্ঠ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এইচ এম নুরুল ইসলাম, রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. তাহাজ্জাত হোসেন, বেঙ্গলি মিডিয়াম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র দাস, মধু বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার, শের-ই-বাংলা আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. কামাল হোসেন অপু, লরেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক শামসুন নাহার পান্না, কনফিডেন্স মেমোরিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন, শাপলা একাডেমির প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার, ২৩ নম্বর ওয়ার্ড মোবাইল প্লেগ্রাউন্ড উদ্যোগের সমন্বয়কারী মো. সেলিম, ছায়াতল বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম মেহেবুবা হকসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

সভায় বক্তারা অভিমত দেন, সুস্থ, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব ঢাকা গড়ে তুলতে মাঠ ও পার্ককে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ