সিলেট ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | নয়াদিল্লি (ভারত), ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত নারী অধিকারকর্মী, লেখক, কবি ও জেন্ডার প্রশিক্ষক কমলা ভাসিনের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
২০২১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে ৭৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার ও নারীবাদী আন্দোলনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে।
১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতের রাজস্থানে জন্ম নেওয়া কমলা ভাসিন সত্তরের দশক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী অধিকার, জেন্ডার সমতা, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। সহজ ভাষা, গান, কবিতা, পোস্টার, নাটক ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি নারীবাদী চিন্তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কমলা ভাসিনের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নারীবাদকে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা। তিনি মনে করতেন, নারীর প্রতি বৈষম্যকে শুধু ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে সমাজের ক্ষমতাকাঠামো, শ্রেণি, জাতপাত, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে তিনি বিকল্প ও সৃজনশীল যোগাযোগপদ্ধতি ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশেও ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা
কাজের সূত্রে কমলা ভাসিন নিয়মিত বাংলাদেশে আসতেন। দেশের নারী আন্দোলন, জেন্ডার সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি নারী-পুরুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, পিতৃতন্ত্র ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।
নারী অধিকারকর্মীদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও তাঁর লেখা, বক্তব্য ও কবিতা ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। তাঁর বহুল উদ্ধৃত কবিতা ও গানগুলো নারী ও শিশুর অধিকার, স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
কমলা ভাসিন রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ফেলোশিপ নিয়ে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। জার্মানিতে কিছু সময় কাজ ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
ভারতে ফিরে তিনি রাজস্থানের সেবা মন্দিরে কাজ শুরু করেন। সেখানে গ্রামীণ সমাজ, দারিদ্র্য, জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর নারী অধিকার ও জেন্ডারভিত্তিক কাজের ভিত্তি গড়ে দেয়।
২০০২ সালে তিনি জাতিসংঘের চাকরি ছেড়ে নারীবাদী সংগঠন ‘সঙ্গত’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সঙ্গতের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় নারীবাদী প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেন। প্রান্তিক নারী, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
কমলা ভাসিনের দর্শনে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনও জরুরি ছিল। তাই তিনি নারীবাদী তত্ত্বকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেন।
তিনি ‘সঙ্গত: এশিয়ান ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে কাজের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ আন্দোলনের সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর লেখা ও প্রশিক্ষণসামগ্রী দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জেন্ডার সচেতনতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে।
কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ
কমলা ভাসিন নিজেকে শুধু একজন নারী অধিকারকর্মী হিসেবে নয়, কবি ও গীতিকার হিসেবেও পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গান ও কবিতা লিখেছেন। শিশু ও নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর বেশ কিছু কবিতা মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৯৫ সালে তিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে বহুল পরিচিত ‘আজাদি’ কবিতার একটি নারীবাদী সংস্করণ পরিবেশন করেন। তাঁর কবিতা ও গান ছিল সহজ, ছন্দময় এবং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণেই তাঁর বক্তব্য প্রশিক্ষণকক্ষের বাইরেও আন্দোলনকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর বহুল পরিচিত কবিতা ‘কিউঁকি ম্যায় লড়কি হুঁ, মুঝে পড়না হ্যায়’—এর মধ্য দিয়ে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
কমলা ভাসিন নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন, ‘আমি একজন নারীবাদী, আমি একজন মানবাধিকারকর্মী, আমি একজন কবি, সমাজসচেতন মানুষ—আমি কমলা।’
মৃত্যু ও স্মরণ
২০২১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কমলা ভাসিনের মৃত্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মী ও সংগঠনগুলো শোক প্রকাশ করে। মৃত্যুর পরও তাঁর লেখা, প্রশিক্ষণপদ্ধতি, গান ও কবিতা নারী অধিকার আন্দোলনে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নারী অধিকার সংগঠনের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল এক বিবৃতিতে কমলা ভাসিনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানও তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক তাপস কুমার ঘোষ, তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটি (গ্রাসরুটস)-এর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি শ্যামলী সূত্রধর ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা তাহমিনা বেগম, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন এবং শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদও তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল মুশরাফিয়া এবং বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি মৌ দেব ও সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াসা ঘোষ কমলা ভাসিনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার আন্দোলনে কমলা ভাসিনের কয়েক দশকের কাজ তাঁকে একটি প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলেছে। তাঁর প্রয়াণের পাঁচ বছর পরও জেন্ডার সমতা, নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর চিন্তা ও কাজ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি