অতশী মমর মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন: মানসিক অবসাদ ও রাজনৈতিক সংগঠনের দায়

প্রকাশিত: ১:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৬

অতশী মমর মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন: মানসিক অবসাদ ও রাজনৈতিক সংগঠনের দায়

Manual5 Ad Code
  • সাংগঠনিক পরিচয় প্রাধান্য পাওয়ায় ব্যক্তিগত সত্তা ও পদত্যাগের সিদ্ধান্তের স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক; অবসাদকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সংস্কৃতি পরিবর্তনের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ অক্টোবর ২০২৬ : তরুণী অতশী মমর মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মানসিক স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিষণ্নতাকে সামাজিকভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। চাঁদপুরে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না থাকায় ঘটনাটি নিয়ে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

Manual2 Ad Code

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখক লুবনা ইয়াসমিনের একটি বক্তব্য এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘অতশী মমকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। ক্লিনিক্যাল অবসাদ শুধু মন খারাপ নয়। ক্লিনিক্যাল অবসাদ বুর্জোয়া ফ্যাশন নয়।’

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা মহানগর শাখার প্রকাশিত একটি শোকবার্তা। ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ওই বার্তায় অতশী মমকে সংগঠনটির ঢাকা মহানগর শাখার দপ্তর সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।

তবে শোকবার্তায় তাঁর বয়স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রূপ কথা’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, মম আগেই সংগঠনটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এ দাবির স্বাধীন সত্যতা এবং পদত্যাগের সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ কারণে শোকবার্তায় তাঁকে সাবেক কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিতর্কটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিষয়: একজন মানুষকে স্মরণ করার সময় তাঁর সাংগঠনিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও স্বতন্ত্র সত্তাকেও কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়?

শোকবার্তার ভাষা ও ব্যক্তিসত্তার প্রশ্ন

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রকাশিত শোকবার্তায় মূলত অতশী মমর সাংগঠনিক পদ এবং তাঁর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের সংক্ষিপ্ত শোকবার্তা সংগঠনগুলোর প্রচলিত রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি সংগঠন ছেড়ে গেলে কিংবা তাঁর পরিচয় ও সম্পর্কের অবস্থায় পরিবর্তন এলে, তাঁকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের স্বীকৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না।

‘রূপ কথা’র বক্তব্য অনুযায়ী, মম সংগঠনটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, মৃত্যুর পরও তাঁকে সেই পরিচয়ে উপস্থাপন করা তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায় না।

Manual4 Ad Code

এ বিষয়ে সংগঠনটির বক্তব্য এবং পদত্যাগের দাবির স্বাধীন যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ চর্চা নিয়ে একটি বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক সংগঠন সাধারণত সদস্যদের একটি সম্মিলিত পরিচয় দেয়। কিন্তু সেই পরিচয় ব্যক্তির সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। একজন কর্মী সংগঠনের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, লেখক, বন্ধু, পরিবারের সদস্য এবং নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানুষ। সংগঠন থেকে সরে আসার পরও তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ থাকে।

তাই শোক প্রকাশের পাশাপাশি ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত, মর্যাদা ও পরিচয়কে সম্মান করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

অবসাদ কি এখনো সামাজিকভাবে অবহেলিত?

অতশী মমর মৃত্যুকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। বাংলাদেশে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনকে অনেক সময় সাময়িক মন খারাপ, দুর্বল মানসিকতা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় সহায়তা চাইতে সংকোচ বোধ করতে পারেন।

Manual3 Ad Code

ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতাজনিত ব্যাধি সাধারণ মন খারাপের সমার্থক নয়। এটি এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা, যা মানুষের আবেগ, চিন্তা, ঘুম, ক্ষুধা, মনোযোগ, দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তি আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন, সেগুলোর প্রতিও আগ্রহ হারাতে পারেন। নিজেকে মূল্যহীন মনে করা, অতিরিক্ত অপরাধবোধ, ক্লান্তি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর হতাশাও দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাউকে ‘মন শক্ত করতে’ বলা, তাঁর সমস্যাকে ছোট করে দেখা কিংবা জীবনে সবারই সমস্যা আছে বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সহায়ক নাও হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, ওষুধ, সামাজিক সহায়তা এবং অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে বিষণ্নতার চিকিৎসা করা সম্ভব।

তবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ বা মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া অনুমান করা উচিত নয়। অতশী মম বিষণ্নতায় ভুগছিলেন কি না, তাঁর চিকিৎসা চলছিল কি না কিংবা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, সমাজ এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারছে কি না, যেখানে কেউ মানসিক সংকটে পড়লে নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা চাইতে পারেন।

রাজনৈতিক পরিচয় কি মানসিক যন্ত্রণাকে আড়াল করে?

মূল আলোচনায় বামপন্থী রাজনীতির একটি অংশে মানসিক অবসাদকে ‘বুর্জোয়া সমস্যা’ হিসেবে দেখার প্রবণতার সমালোচনা করা হয়েছে। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যক্তিগত মানসিক সংকটকে কখনো শ্রেণিগত অবস্থান, রাজনৈতিক সচেতনতা কিংবা ব্যক্তির দৃঢ়তার সঙ্গে বিচার করা হয়।

শ্রেণিবৈষম্য, দারিদ্র্য, শোষণ, লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন ও সামাজিক অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ব্যাখ্যা করা যায় না। জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত নানা উপাদান এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন শ্রমিক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, নারী অধিকারকর্মী কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠকেরও বিষণ্নতা হতে পারে। রাজনৈতিক সচেতনতা বা সাংগঠনিক সক্রিয়তা কাউকে মানসিক অসুস্থতা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না।

কেউ নিজের মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করলে সহকর্মীরা তাঁকে দুর্বল ভাববেন, দায়িত্ব পালনে অক্ষম মনে করবেন কিংবা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন—এমন আশঙ্কা থাকলে তিনি নিজের কষ্ট গোপন করতে পারেন।

ধর্মীয় পরিসরেও কখনো মানসিক সমস্যাকে বিশ্বাসের অভাব, পাপ কিংবা ধর্মীয় অনুশাসন না মানার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রার্থনা ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক মানুষের জন্য মানসিক সান্ত্বনা ও সামাজিক সহায়তার উৎস হতে পারে। কিন্তু এগুলোকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে মানুষের সব ব্যক্তিগত সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করলেও ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশীলন কিংবা ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসা ও সহমর্মিতাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

Manual3 Ad Code

সংগঠনের অভ্যন্তরে ব্যক্তিস্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত?

অতশী মমকে ঘিরে আলোচনায় রাজনৈতিক সংগঠনের সংস্কৃতি, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব এবং ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কোনো সংগঠনের ঘোষিত আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে সদস্যদের অভিজ্ঞতা, মতপার্থক্য ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন যথাযথ গুরুত্ব না-ও পেতে পারে। বিশেষত তরুণ সদস্যদের ক্ষেত্রে সংগঠনের অনুমোদন, জ্যেষ্ঠদের মতামত এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকার চাপ স্বাধীনভাবে কথা বলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন সম্পর্কে এমন অভিযোগ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একক কোনো ঘটনা থেকে সব রাজনৈতিক সংগঠন সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্ত টানা যুক্তিসংগত নয়।

রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব শুধু সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা নয়; তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন। মতপার্থক্য প্রকাশ, সংগঠন ছেড়ে যাওয়া কিংবা মানসিক সংকটের কথা জানানোর অধিকারও ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ।

নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। নারী অধিকার ও সমতার কথা বলার পাশাপাশি একজন নারী সদস্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, স্বাধীন মতামত এবং সংগঠন থেকে সরে আসার অধিকার বাস্তবে কতটা সম্মান করা হয়, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কোনো নারী রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে সেখান থেকে বেরিয়েও আসতে পারেন। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়কে কেবল সাংগঠনিক অবস্থান দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

ব্যক্তি বনাম মতাদর্শ: ইতিহাসের শিক্ষা

রুশ লেখক বরিস পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো উপন্যাস ও এর চলচ্চিত্ররূপে বিপ্লব, ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত জীবনের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। ১৯৬৫ সালের চলচ্চিত্রে পাশা আন্তিপভ, যিনি পরে স্ত্রেলনিকভ নামে পরিচিত হন, তাঁর সংলাপ—‘The personal life is dead in Russia. History has killed it’—ব্যক্তিজীবনের ওপর ইতিহাসের কর্তৃত্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এটি চলচ্চিত্রের সংলাপ, উপন্যাস থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।

পাস্তেরনাকের সাহিত্য মনে করিয়ে দেয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষের প্রেম, শোক, বিবেক, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূল্য রয়েছে। কোনো মতাদর্শ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন ব্যক্তির সব অভিজ্ঞতার ওপর কর্তৃত্ব দাবি করে, তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ইতিহাসকে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবে এই সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণ প্রশ্ন তোলা যায়: কোনো সংগঠন নিজের আদর্শ ও ভাবমূর্তি রক্ষা করতে গিয়ে তার সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মতপার্থক্য ও স্বাধীন সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে কি না।

একই প্রশ্ন সাংস্কৃতিক পরিসর ও পাঠচক্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রশ্ন তোলা, যুক্তি পরীক্ষা করা এবং ভিন্নমত শোনা। মতাদর্শিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে পড়তে বা না পড়তে নির্দেশ দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক জ্ঞানের অভাব দেখিয়ে তাঁর বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মুক্ত চিন্তার পরিসর সংকুচিত করতে পারে।

আত্মহত্যার সংবাদ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই মানুষের কৌতূহল কেন্দ্রীভূত হয় মৃত্যুর পরিস্থিতি, সম্ভাব্য দায়ী ব্যক্তি কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনের ওপর। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবস্থা, সামাজিক সহায়তা এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিয়েও দায়িত্বশীল আলোচনা প্রয়োজন।

আত্মহত্যা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ঘটনা। সব আত্মহত্যার পেছনে বিষণ্নতা থাকে না, আবার বিষণ্নতায় আক্রান্ত কিছু মানুষের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ব্যক্তিগত সংকট, মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই কোনো একটি কারণ দিয়ে প্রতিটি মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা তার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আরোপ করা উচিত নয়।

আলোচনায় ২০১৯ সালে ১৭ বছর বয়সী শ্রেয়সী আহমেদ ঐশীর মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর চিকিৎসা এবং চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে সে সময় বিতর্ক ও তদন্তের কথা বলা হয়। তবে ঘটনার চিকিৎসাসংক্রান্ত বিবরণ, তদন্তের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশের আগে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নথি ও নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র দিয়ে পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ধরনের ঘটনা মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় যথাযথ মূল্যায়ন, চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, রোগী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পেশাগত জবাবদিহির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রয়োজন সহমর্মিতা, চিকিৎসা ও জবাবদিহি

অতশী মমর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং পদত্যাগের দাবি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা জরুরি।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অনুমান বা অপ্রমাণিত অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে দায়িত্বশীল অনুসন্ধানই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। পরিবারের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা এবং বিষণ্নতাকে দুর্বলতা বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রবণতা কমানো প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক পরিসর—সব জায়গাতেই এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে মানসিক সংকটে থাকা মানুষকে বিচার না করে তাঁর কথা শোনা হবে।

অতশী মমকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ নয়; তাঁর নিজস্ব পরিচয় ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করার প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর ব্যক্তিসত্তার বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে, রাজনৈতিক দৃঢ়তা কিংবা সামাজিক অগ্রগতির দাবি ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণাকে অস্বীকার করার যুক্তি হতে পারে না।

যে সমাজ মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার কথা বলে, সেই সমাজের দায়িত্ব মানুষের ভঙ্গুরতাকেও স্বীকার করা। মানসিক অবসাদকে গুরুত্ব দেওয়া, সাহায্য চাওয়ার পথ সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা ব্যক্তিগত ও সামাজিক—উভয় পর্যায়েই জরুরি।

অতশী মমর মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তাঁর স্মৃতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকার অর্থ হলো, তথ্যের সীমা স্বীকার করা, অপ্রমাণিত বক্তব্য এড়িয়ে চলা এবং একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোকে আলোচনার বাইরে না রাখা।