সিলেট ৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২২ মার্চ ২০২৬ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়, এটি ত্যাগ, সাহস, বেদনা এবং আত্মদানের ইতিহাস।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বীর সন্তান তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। তাঁদেরই একজন বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ, যিনি চাঁদরাতে শহীদ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
ঈদের দিন সাধারণত আনন্দের দিন, কিন্তু ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক বেদনাবিধুর দিন। ওই দিন তাঁরা হারিয়েছিলেন তাঁদের সাহসী সহযোদ্ধা, সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদকে।
আশফাকুস সামাদের পুরো নাম আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দেশ যখন মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তিনি পড়াশোনা ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে চলে যান। বন্ধুদের নিয়ে ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। জুন মাসে তিনি বাংলাদেশ ওয়ার কোর্সের ক্যাডেট অফিসার হিসেবে নির্বাচিত হন। জলপাইগুড়িতে প্রায় সাড়ে তিন মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ৯ অক্টোবর তিনি সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করেন।
পরবর্তীতে তাঁকে ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টরের একটি কোম্পানির কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা জয়মনিরহাট, ভূরুঙ্গামারী ও রায়গঞ্জ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে ভূরুঙ্গামারী ও আশপাশের এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে এনে সেখানে একটি মুক্তাঞ্চল গঠন করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯ নভেম্বর রাতে লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থানার রায়গঞ্জ দখল করতে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি পরিকল্পিত ফাঁদে তাঁরা পড়ে যান। তবুও আশফাকুস সামাদ বিচলিত হননি। তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে ওঠে। তখন তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের পেছনে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে তারা বেঁচে থাকতে পারে এবং আবার সংগঠিত হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। আর তিনি নিজে একাই মেশিনগান হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটি ছিল অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এক পর্যায়ে শত্রুবাহিনীর একটি গুলি তাঁর হেলমেট ভেদ করে মাথায় আঘাত করে। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাতবরণ করেন। ওই যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে আরও শহীদ হন ইপিআরের সিপাহি কবীর আহমেদ, আবদুল আজিজসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।
২০ নভেম্বর ভোরে, অর্থাৎ ঈদের দিন, রায়গঞ্জ ব্রিজের কাছে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদের মরদেহ। পরে উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন এবং সামরিক কায়দায় তাঁকে স্যালুট জানান। লালমনিরহাট মসজিদের পাশে জানাজা শেষে তাঁকে ৪১ বার গান স্যালুট দেওয়া হয়—যা তাঁর বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন নেতৃত্ব, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সহযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্বাধীনতার এত বছর পরও তাঁর মতো বীরদের স্মরণ করা শুধু ইতিহাসচর্চা নয়, এটি আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে—এই স্বাধীনতা হঠাৎ করে আসেনি; অসংখ্য আশফাকুস সামাদের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।
বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ তাই শুধু একজন শহীদ নন, তিনি বাংলাদেশের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের জন্য জীবন দেওয়া মানুষ কখনো মৃত্যুবরণ করেন না, তাঁরা ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন।
‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট শহীদ আশফাকুস সামাদ স্মরণে তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—
চাঁদ উঠেছিল নীরব রাতে, সীমান্ত জুড়ে ধোঁয়া,
নদীর জলে কুয়াশা নেমে কাঁপছিল ক্ষণগোনা।
দূর আকাশে যুদ্ধবিমানের আগুনরাঙা দাগ,
বাংলার মাটি অপেক্ষাতে, শেষ হবে কবে ভাগ।
চারদিকে শুধু যুদ্ধের গান, বন্দুকেরই ভাষা,
স্বাধীনতার স্বপ্নে তখন জ্বলছে সবার আশা।
মায়ের চোখে অশ্রু ঝরে, বোনের প্রার্থনা,
দেশটা যেন স্বাধীন হয়—এই ছিল কামনা।
ঢাকা শহর থেকে এক তরুণ, বইখাতা ফেলে,
দেশমাতার ডাক শুনে যায় যুদ্ধক্ষেত্রের ঢেউয়ে।
পরিসংখ্যানের ছাত্র ছিল, স্বপ্ন ছিল বড়,
কিন্তু তখন দেশের ডাকে জীবন দিলো ওড়।
নাম তার আশফাকুস সামাদ, বীরের মতো প্রাণ,
দেশের জন্য যুদ্ধ করা—এই ছিল তার জ্ঞান।
বন্ধুদের নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণের পথে,
শপথ নিল—দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত রথে।
জলপাইগুড়ির কঠোর দিনে ঘাম ঝরেছে বুকে,
রাইফেল কাঁধে শিখেছে সে যুদ্ধ কেমন সুখে।
সাড়ে তিন মাস আগুনপথে গড়েছে নিজের মন,
অক্টোবরের সকালে পেল লেফটেন্যান্টের সম্মান।
সাহেবগঞ্জের সাবসেক্টরে দায়িত্ব তার কাঁধে,
তরুণ অফিসার নেতৃত্ব দেয় সাহসী মুক্তিবাহিনীতে।
জয়মনিরহাট, ভূরুঙ্গামারী—যুদ্ধের আগুন জ্বলে,
তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে চলে দলে দলে।
ভূরুঙ্গামারীর আকাশ জুড়ে স্বাধীন পতাকা উড়ে,
শত্রুবাহিনী পিছু হটে মুক্তাঞ্চল গড়ে।
সেই তরুণের দৃপ্ত কণ্ঠে সাহস পায় দল,
দেশমাতার জন্য সবাই প্রস্তুত অবিচল।
নভেম্বরের রাত নেমেছে, চাঁদের আলো ফিকে,
রায়গঞ্জ পানে মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে চলে নীরবে।
কিন্তু শত্রু আগে থেকেই পেতে রেখেছে ফাঁদ,
তবুও থামে না এগিয়ে যাওয়া আশফাকুস সামাদ।
হঠাৎ করে গুলির শব্দ, চারদিক অন্ধকার,
মেশিনগানের আগুনঝড়ে কেঁপে ওঠে পার।
সহযোদ্ধারা লড়ছে তখন জীবন বাজি রেখে,
সামাদ তখন সামনে দাঁড়ায় মৃত্যুকে কাছে দেখে।
পরিস্থিতি যখন কঠিন হয়ে চারদিক ঘিরে যায়,
তিনি তখন নির্দেশ দিলেন—“তোমরা পিছু হট ভাই।
বেঁচে থাকলে আবার লড়বে, স্বাধীন হবে দেশ,
আমার কথা ভাববে না আর, এগিয়ে যাও শেষ।”
সহযোদ্ধারা পিছু হটে অশ্রুভেজা চোখে,
একাই তখন দাঁড়িয়ে তিনি মেশিনগানটি বুকে।
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে একটি বাহিনীর বিপরীতে,
ইতিহাস তখন লেখা হচ্ছিল রক্তের অক্ষরে।
পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এগিয়ে আসে গুলির ঝড় তুলে,
তিনি তখন গুলি ছুড়েন বুকের আগুন খুলে।
একজন মানুষ, একা দাঁড়িয়ে, যুদ্ধ করে যায়,
বাংলার মাটি স্বাধীন হবে—এই বিশ্বাসে চায়।
হঠাৎ একটি গুলি এসে হেলমেট ভেদ করে,
রক্ত ঝরে লাল নদীর মতো মাটির বুকে পড়ে।
চাঁদের আলো নিভে আসে, থেমে যায় সব শব্দ,
বাংলার বুকে জন্ম নেয় এক অমর ইতিহাস তখন।
ঈদের ভোরে মানুষ যখন নামাজ পড়ে গ্রামে,
রায়গঞ্জ ব্রিজের পাশে বীর ঘুমিয়ে থাকে থামে।
মুক্তিযোদ্ধারা এসে তখন স্যালুট জানায় তাকে,
দেশের জন্য জীবন দিল যে হাসিমুখে রেখে।
লালমনিরহাট মসজিদের পাশে জানাজা হয় তার,
একচল্লিশ বার গান স্যালুট কাঁপায় আকাশপার।
বাংলার মানুষ মাথা নত করে সেই দিনের তরে,
একজন বীর ইতিহাস হয়ে থাকে চিরকাল ধরে।
তিনি শুধু একজন সৈনিক ছিলেন না কোনোদিন,
তিনি ছিলেন সাহসের নাম, ত্যাগের প্রতিদিন।
সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে যিনি জীবন দিলেন হেসে,
বাংলাদেশের ইতিহাসে থাকবেন চিরদিন ভেসে।
আজও যখন স্বাধীনতার পতাকা আকাশে উড়ে,
মনে পড়ে সেই বীরদের, যারা গেছে ঝড়ে।
স্বাধীনতা হঠাৎ আসেনি, রক্তের নদী বয়ে,
অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ দাঁড়ায় লয়ে।
নতুন প্রজন্ম মনে রেখো ইতিহাসের কথা,
স্বাধীনতার পেছনে আছে অগণিত ব্যথা।
আশফাকুস সামাদ শুধু একটি নাম নয়,
বাংলাদেশের সাহস, গৌরব, আত্মত্যাগের জয়।
চাঁদরাতে যে বীর ঘুমালো দেশের মাটির কোলে,
বাংলার মানুষ মনে রাখবে তাকে যুগের পরে যুগে।
যতদিন এই বাংলায় লাল-সবুজ পতাকা উড়বে,
ততদিন আশফাকুস সামাদ ইতিহাস হয়ে বাঁচবে।
—(“চাঁদরাতে শহীদ আশফাকুস সামাদ”—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি