গোয়ালমারী যুদ্ধ দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২৫

গোয়ালমারী যুদ্ধ দিবস আজ

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা (দক্ষিণ), ২০ নভেম্বর ২০২৫ : কুমিল্লার দাউদকান্দির গোয়ালমারী যুদ্ধ দিবস আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে দাউদকান্দি ও মতলবের মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন করেন। টানা ১৫ ঘণ্টার এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শহীদ হন ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এই দিনের স্মৃতি আজও এলাকাবাসীর মনে শিহরণ জাগায়।

ঈদের সকালে আকস্মিক হামলা

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। ভোরের আলো ফুটতেই গোয়ালমারী–জামালকান্দি অঞ্চল জুড়ে শোনা যায় ফজরের আজান। মানুষ যখন নামাজের প্রস্তুতিতে, ঠিক সেই সময়ই নেমে আসে পাক বাহিনীর মর্টার শেলের ভয়াবহ হামলা। গোয়ালমারী বাজার এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে হানাদাররা শুরু করে নির্বিচার গোলাবর্ষণ।

হঠাৎ আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা বিচলিত না হয়ে মুহূর্তেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। রণক্ষেত্রে রূপ নেয় গোয়ালমারী বাজার, জামালকান্দি, লামছড়ি, কালাইরকান্দি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহ। ভোর সাড়ে চারটা থেকে শুরু হয়ে যুদ্ধ চলে পরদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত—একটানা ১৫ ঘণ্টা।

দাউদকান্দি–মতলবের সম্মিলিত প্রতিরোধ

Manual5 Ad Code

যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে দাউদকান্দির মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় পশ্চিম দিকের কালীর বাজার ও মোলাকান্দি হয়ে মতলবের কমান্ডার আব্দুল অদুদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী এগিয়ে আসে। দুই উপজেলার যোদ্ধাদের এই সম্মিলিত আক্রমণে পাক সেনারা ক্রমে উত্তরে পিছু হটে দাউদকান্দি সদরের ডাকবাংলো ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সেই পথও মুক্তিযোদ্ধারা আটকে দেন।

উত্তর–দক্ষিণ দুই দিক থেকে ঘেরাটোপে পড়ে হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৭০ জন পাক সেনা নিহত হয়।

Manual1 Ad Code

পরদিন সর্বত্র ভেসে ওঠে মৃতদেহ

পরের দিন সকালেই জামালকান্দি, ডুনি নছরুদ্দি, দৌলদ্দি, লামছড়ি, গোয়ালমারীসহ আশপাশের ধানক্ষেত, খাল–বিল, ডোবা–নালায় হানাদার বাহিনীর মৃতদেহ ভেসে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির হয়ে আসে বিজয়ের নীরবতা।

এলাকার ১১ জনের বীরোচিত শাহাদাত

গোয়ালমারীর সেই যুদ্ধ কেবল বিজয় নয়—দাউদকান্দির মানুষের জন্য বেদনারও স্মারক। এ যুদ্ধে শহীদ হন—

বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমীন (সুন্দলপুর),
মোস্তাক আহমেদ (রফারদিয়া),
আব্দুর রহমান সরকার (জামালকান্দি),
সামছুন্নাহার ও তার কন্যা রেজিয়া খাতুন,
সাইদুর রহমান ও আছিয়া খাতুন,
গিয়াসউদ্দিন (কামাইরকান্দি),
শহীদ উলাহ (সোনাকান্দা),
নুরুল ইসলাম (রফারদিয়া),
ইয়াসমীন পাগলী (গোয়ালমারী বাজার)।

যোদ্ধাদের নেতৃত্ব ও অবদান

সাবেক মৎস্য অধিদফতরের পরিচালক নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে সে সময় যাঁরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন— ওহাব সরকার, ফজলু সরকার, আব্দুল কুদ্দুস সরকার, খোরশেদ আলম, আবুল হোসেন, কে. এম. আই. খলিল, হুমায়ুন কবির, আবুল বাশার, শাহজাহান মিয়া এবং মতলবের কমান্ডার আব্দুল অদুদসহ আরও অনেকে।

স্মরণসভা ও মিলাদ মাহফিল

Manual2 Ad Code

প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি উপলক্ষে গোয়ালমারী বাজারে দাউদকান্দি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল, শহীদদের স্মরণে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

দাউদকান্দি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম বলেন,
“গোয়ালমারীর যুদ্ধ দাউদকান্দির ইতিহাসে অসামান্য বিজয়ের দিন। আমরা প্রতিবছর শহীদদের স্মরণ করি, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানানোই সবচেয়ে জরুরি।”

Manual3 Ad Code

ঐতিহাসিক স্বাক্ষর হয়ে আছে ২০ নভেম্বর

গোয়ালমারীর যুদ্ধ শুধু দাউদকান্দির নয়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাহস, আত্মত্যাগ ও সম্মিলিত শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরও সে দিনের স্মৃতি এখনও এলাকাবাসীর মনে গা শিউরে ওঠার মতো বেদনা ও গর্বের মিশ্র অনুভূতি জাগায়।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ