রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি: চা–শ্রমিক সমাজের অগ্নিঝরা সংগ্রামের অক্লান্ত সেনানী

প্রকাশিত: ১:২৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২৫

রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি: চা–শ্রমিক সমাজের অগ্নিঝরা সংগ্রামের অক্লান্ত সেনানী

Manual7 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত |

বাংলাদেশের চা–শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেরা ছিলেন স্বল্পস্বচ্ছল, কিন্তু নেতৃত্ব দিয়েছেন হাজারো মানুষের অধিকার আন্দোলনকে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফুলছড়া চা বাগানের সন্তান রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি সেই অগ্নিপুরুষদের একজন—যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
তাঁর ৮৬ বছরের জীবন কেবল একজন শ্রমিক নেতার জীবন নয়; এটি চা–শ্রমিক সমাজের জাগরণের ইতিহাস, আত্মমর্যাদার ইতিহাস, আর বিরুদ্ধ স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের ইতিহাস।

অদম্য ইচ্ছাশক্তির উৎস: ফুলছড়া বাগান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৪০ সালের ২০ নভেম্বর ফুলছড়া চা বাগানে জন্ম নেওয়া রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি এক সময় হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার চা–শ্রমিক সম্প্রদায়ের প্রথম উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধি। বাবার নাম দাসিয়া সরদার—যিনি নিজেও শ্রমিক সমাজের কষ্ট-দুঃখ দেখেছেন খুব কাছে থেকে। আর এই সমাজ থেকেই উঠে এলেন রাজেন্দ্র, নিজের মেধা ও দৃঢ়তায় ভেঙে দিলেন শিক্ষার সব অদৃশ্য দেয়াল।

১৯৬০ সালে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন সিলেট এমসি কলেজে। এরপর ১৯৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে তিনি ইতিহাস গড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে (এলএলবি) ভর্তি হন—চা শ্রমিক সমাজের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে।
তারপর ১৯৬৮ সালে সরকারি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রে শ্রমকল্যাণ সংগঠক পদে যোগদান করেন মাত্র ১৫০ টাকা বেতনে। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে অন্য জায়গায়—চা–শ্রমিক সমাজের মুক্তির সংগ্রামে।

শৈশবেই নেতৃত্বের বীজ: প্রথম ছাত্র সংগঠন গঠনের গল্প

১৯৫৪ সালে কুলাউড়ায় চা–শ্রমিক ইউনিয়নের এক সভায় বাবার সঙ্গে গিয়ে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন নেতাদের কাছ থেকে সরাসরি শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা শুনেন সপ্তম শ্রেণির এই কিশোর। সেই সভাই তাঁকে প্রশ্ন করায়—শ্রমিকদের ইউনিয়ন থাকলে ছাত্রদের কেন থাকবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন—‘শ্রীহট্ট জেলা চা–শ্রমিক ছাত্র ইউনিয়ন’, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ভ্যালির বাগানে। সিলেটে কলেজে গিয়ে তাঁর সংগঠন আরও বিস্তৃত হয়, তৈরি হয় ছাত্র নেতৃত্বের বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম—যা ভবিষ্যতে চা–শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

সংগঠন ও রাজনীতির কঠিন বাস্তব: সুলেমানের রোষানল থেকে গণআন্দোলনের উত্থান

স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দাবি–দাওয়া তুলে ধরতে গিয়ে তৎকালীন চা–শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম. সুলেমানের বিরোধিতার মুখেও রাজেন্দ্র দলকে সংঘবদ্ধ রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্ররা প্রথম সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দাবি তোলে।
১৯৬৬–৬৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন বাগানভিত্তিক সম্মেলন, মিছিল ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চা–শ্রমিক সমাজে নতুন রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হয়।
১৯৬৯ সালের আন্দোলনে চা–শ্রমিকরা প্রথম সরকারি ন্যূনতম মজুরির স্বীকৃতি পায়—যা শ্রমিক রাজনীতিতে বড় মাইলফলক।

উত্থানের শীর্ষে রাজেন্দ্র গ্রুপ: আধুনিক চা–শ্রমিক ইউনিয়নের জন্ম

১৯৭০ সালে এম. সুলেমানের পলায়নের পর শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক রেলওয়ে মাঠে হাজারো শ্রমিকের উপস্থিতিতে যে নেতৃত্ব গঠিত হয়—সেখানেই জন্ম নেয় আধুনিক চা–শ্রমিক ইউনিয়ন, এবং সর্বসম্মতিক্রমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি।

Manual3 Ad Code

এটি ছিল তাঁর সংগঠনিক জীবনের সোনালি অধ্যায়, যার প্রভাব আজও চা–শ্রমিক সমাজে অনুভূত হয়।

যুদ্ধ, নির্যাতন ও আত্মগোপন: ১৯৭১–এর ভয়াল দিনগুলো

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম আঘাত আসে চা–শ্রমিকদের ওপর। পাক সেনাবাহিনী ভাড়াউড়া, খাদিমনগরসহ বিভিন্ন বাগানে হত্যাযজ্ঞ চালায়।

Manual1 Ad Code

১৯৭১ সালের ৬ জুলাই রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জিকে ফুলছড়া বাগানের ঘর থেকে ধরে সিন্দুরখান ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। পরদিন তিনি সাময়িক মুক্তি পান, কিন্তু সবসময় থাকেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

স্বাধীনতার পর ক্ষমতার রাজনীতি, লাল বাহিনীর উত্থান ও চা বাগানাঞ্চলের রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীনতার পর রাজেন্দ্র ও তাঁর সহকর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যোগ দেননি। এই অ-অনুগত অবস্থানই তাঁদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জন্ম দেয়। তৈরি হয় ‘লাল বাহিনী’। এই বাহিনীর হামলা, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর চা–শ্রমিক এলাকাকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে ১৯৭২ সালে—যেদিন ঘটে চা–শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড:
শহীদ বসন্ত ব্যানার্জি হত্যাকাণ্ড ১৭ বছরের এক কিশোর ছাত্রনেতার নির্মম মৃত্যু সেদিন পুরো সিলেটকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

এক অমর শহীদের স্মৃতি: বসন্ত ব্যানার্জি

৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭২—চা শ্রমিকদের কাছে আজও রক্ত-ঝরা দিন। লাল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে বসন্তকে। এ হত্যা ছিল রাজেন্দ্র গ্রুপের নেতৃত্ব ভাঙার চক্রান্তের অংশ।

তবে উল্টো হয়েছে আরেকটি ইতিহাস—হাজারো চা–শ্রমিক তীর–ধনুক হাতে আন্দোলনে নামেন, শ্রীমঙ্গল স্তব্ধ হয়ে যায়, পুরো সিলেট জেলায় হরতাল পালিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে বিচার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। আজও বিচার হয়নি।

দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব: ২০০৫ সাল পর্যন্ত অদম্য পথচলা

এরপর রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি একটানা ২০০৫ সাল পর্যন্ত চা–শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন—
একটি বিরল, দীর্ঘ, শক্তিশালী নেতৃত্বের ইতিহাস।
তিনি ছিলেন চা–শ্রমিক সমাজের প্রথম উচ্চশিক্ষিত, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা—যার গভীর বিশ্লেষণ, সংগঠনের প্রতি নিষ্ঠা, এবং শ্রমিকদের কল্যাণে আত্মনিবেদন আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সমালোচনা এসেছে, রাজনীতি বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর মতো দূরদৃষ্টি ও তীক্ষ্ণ নেতৃত্ব আজও চা–শ্রমিক সমাজে আর দেখা যায়নি—এমনটাই অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।

আজ তিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, নানা রোগে আক্রান্ত, তবু তাঁর ঘর—ফুলছড়া চা বাগানের বাড়ি ও ফুলছড়া চা বাগান যাবার পথে মনিপুরী পাড়ার প্রবেশ মুখে বর্তমান বাড়িটি—চায়ের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে।

Manual2 Ad Code

রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জির জীবন শুধু একজন ব্যক্তির জীবনী নয়—এটি চা–শ্রমিক সমাজের সংগ্রাম, শিক্ষা, রাজনৈতিক চেতনা এবং আত্মমর্যাদার উত্থানের গল্প।
তিনি দেখিয়েছেন—একটি নিপীড়িত সম্প্রদায়ের শিশু–কিশোরও একদিন ইতিহাস রচনা করতে পারে।
তাঁর নেতৃত্বের উত্তরাধিকার আজও চা–শ্রমিক সমাজকে পথ দেখায়।

জন্মদিনে এই অগ্নিঝরা সংগ্রামের পথিকৃতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা—যিনি তাঁর জীবনভর লড়েছেন শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়ের জন্য।
#
সংগ্রাম দত্ত
সিনিয়র সাংবাদিক
শ্রীমঙ্গল।

Manual4 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ