খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব ‘খাসি সেং কুটস্নেম’ অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ৬:১৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২৫

খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব ‘খাসি সেং কুটস্নেম’ অনুষ্ঠিত

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার), ২২ নভেম্বর ২০২৫ : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির খেলার মাঠ রাঙিয়ে আজ শনিবার (২২ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হলো খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সার্বজনীন বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব—‘খাসি সেং কুটস্নেম’।

সিলেট বিভাগের প্রায় ৭০টি খাসিয়া পুঞ্জি থেকে কয়েক হাজার খাসিয়া নারী-পুরুষ, বাঙালি দর্শনার্থী এবং বিদেশি পর্যটকের অংশগ্রহণে পুরো পুঞ্জি পরিণত হয় রঙ-বেরঙের মিলনমেলায়।

ঐতিহ্য, কৃতজ্ঞতা ও নতুন বছরের আহ্বান

খাসিয়াদের কাছে সেং কুটস্নেম শুধুই উৎসব নয়; এটি দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, সময়ের চক্রবদলকে বরণ এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার আদি ঐতিহ্য। বাঁশের খুঁটির ওপর নারিকেল পাতার ঐতিহ্যবাহী ছাউনি ঘেরা মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও অতিথি সংবর্ধনা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন মাগুরছড়া পুঞ্জির প্রধান ও বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো-চেয়ারম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), আরপি নিউজের সম্পাদক, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট-এর বিশেষ প্রতিনিধি ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশ, গণমাধ্যম কর্মী দেওয়ান মাসুকুর রহমানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে পুঞ্জি প্রধানদের পাগড়ি পরিয়ে সম্মাননা এবং আগত অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসবে কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

সংকটের ভেতরেও উৎসব—রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সম্ভব হলো আয়োজন

Manual4 Ad Code

গত বছর চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এই উৎসব আয়োজন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের আগ্রহের ফলে তা আয়োজন সম্ভব হয়। এবছরও পান ব্যবসায় মন্দা ও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় খাসিয়া জনগোষ্ঠী আর্থিক দুরবস্থায় ভুগলেও রাষ্ট্র, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নতুন উদ্যম নিয়ে উৎসবটি সম্পন্ন করেন তারা।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অনিলজয় ডিখার বলেন, “পান ব্যবসায় সংকট আমাদের কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। তারপরও সরকারের অনুদান, প্রশাসনের সহায়তা এবং নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে এবছরও উৎসব করতে পেরেছি—এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”

কাউন্সিলের সভাপতি জিডিশন প্রধান সুচিয়াং বলেন,
“এই উৎসব আমাদের পরিচয় ও সামাজিক বন্ধনের অংশ। সংকট থাকলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের নতুন শক্তি দিয়েছে।”

Manual6 Ad Code

পাহাড়ি নৃত্য, আদি গান ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আয়োজন

উৎসব জুড়ে ছিল খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—

পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য,
আদি ভাষার গান,
তীর-ধনুকের প্রদর্শনী,
জুম চাষ ও জীবনযাপনভিত্তিক নাট্য উপস্থাপনা।

Manual8 Ad Code

তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বড়োরা বলেন, এই উৎসবই নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাস, আদি ধর্মবিশ্বাস, পোশাক, রীতিনীতি ও শিল্পচর্চার সঙ্গে পরিচয় করায়।

মাছ শিকার, খেলাধুলা ও ঐতিহ্যবাহী মেলায় দিনব্যাপী উৎসব

Manual3 Ad Code

ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুঞ্জির মাঠ ছিল হৈচৈ-আনন্দে সরব। আয়োজনের মধ্যে ছিল—

মাছ শিকার প্রতিযোগিতা,
ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা,
পাহাড়ি খাবারের স্টল,
বাঁশ-বেতের তৈরি হস্তশিল্প,
খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও পান বিক্রির স্টল।

দর্শনার্থীদের পদচারণায় পুরো মাগুরছড়া পুঞ্জি রূপ নেয় খাসিয়া সংস্কৃতির প্রাণবন্ত বাজারে।

আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ভূমিকার দাবি

উৎসবে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা নেতা ও সিনিয়র সাংবাদিক কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “খাসিয়াসহ সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এখন সময়ের দাবি।”

ঐতিহ্য রক্ষার শপথ

বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবের শেষভাগে খাসিয়া নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন সামাজিক ঐক্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার। তাদের কথায়, খাসি সেং কুটস্নেম উৎসব শুধু এক দিনের অনুষ্ঠান নয়—এটি খাসিয়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, পরিচয় এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার প্রতীক।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ