প্রথিতযশা সাংবাদিক ও বাম প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ কমরেড নির্মল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০২৬

প্রথিতযশা সাংবাদিক ও বাম প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ কমরেড নির্মল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ : প্রথিতযশা সাংবাদিক, বিশিষ্ট কলামিস্ট, বাম প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড নির্মল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দিনটি উপলক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে।

২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে দেশ হারায় এক আপসহীন চিন্তক, নির্ভীক সাংবাদিক ও আদর্শনিষ্ঠ বিপ্লবী রাজনীতিবিদকে।

জন্ম, পরিবার ও শৈশব

কমরেড নির্মল সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের গণিত শিক্ষক এবং মাতা লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্ত ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে নির্মল সেন ছিলেন পঞ্চম।

দেশ বিভাগের পর তাঁর বাবা-মা ও অন্যান্য ভাইবোনরা ভারতে চলে গেলেও জন্মভূমির প্রতি গভীর টান ও দায়বদ্ধতার কারণে নির্মল সেন এদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় তিনি কাটান ঝালকাঠি জেলার তাঁর পিসির বাড়িতে।

শিক্ষাজীবন

নির্মল সেন ১৯৪৪ সালে ঝালকাঠি জেলার কলসকাঠি বিএম একাডেমি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (বিএ) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনেই তাঁর মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা ও রাজনৈতিক সচেতনতা দৃঢ়ভাবে বিকশিত হয়।

রাজনৈতিক জীবন: সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস

স্কুল জীবনেই ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্মল সেনের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। কলেজ জীবনে তিনি বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আরএসপি (রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি)-তে যোগ দেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক আদর্শে অবিচল থেকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আজীবন যুক্ত ছিলেন। এই সংগ্রামের পথে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে এবং জীবনের দীর্ঘ সময় জেলে কাটাতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কমরেড নির্মল সেন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি শুধু একটি সামরিক সংগ্রাম নয়, বরং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর লেখালেখি আজও গবেষক ও নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সাংবাদিকতা: নির্ভীক কলমের অধিকারী

১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার মাধ্যমে নির্মল সেনের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান এবং দৈনিক বাংলা-তে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেন। শোষণ, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সবসময় সোচ্চার।

তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করে তিনি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক তৈরিতে অবদান রাখেন।

লেখক হিসেবে নির্মল সেন

নির্মল সেন ছিলেন এক শক্তিশালী চিন্তাবিদ লেখক। তাঁর রচনাগুলো ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে—
পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ,
মানুষ সমাজ রাষ্ট্র,
বার্লিন থেকে মস্কো,
মা জন্মভূমি,
স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই,
আমার জীবনে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ,
আমার জবানবন্দি।

Manual7 Ad Code

এই গ্রন্থগুলোতে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন রাষ্ট্র ও সমাজ বিশ্লেষণের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি।

ওয়ার্কার্স পার্টির শ্রদ্ধা

Manual4 Ad Code

কমরেড নির্মল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল। এক শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, “কমরেড নির্মল সেন ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ বিপ্লবী, যাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।”

Manual3 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামানসহ নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা

এ উপলক্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

এ ছাড়া আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদক তাপস ঘোষ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দীন, শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদ।

শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল মুশরাফিয়া, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অজিত বোনার্জি এবং বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের নেত্রী ও তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সোসাইটি (গ্রাসরুটস)-এর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা তাহমিনা বেগম।

উত্তরাধিকার

কমরেড নির্মল সেন শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক আদর্শ, এক সংগ্রামী চেতনার নাম। সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ—এই তিন ধারাকে একসূত্রে মিলিয়ে তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য সত্য, সাহস ও সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Manual4 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ