মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘প্রবাসীর কথা’ গ্রন্থের লেখক নূরুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘প্রবাসীর কথা’ গ্রন্থের লেখক নূরুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual2 Ad Code

সৈয়দা নাজমা শবাব, বিশেষ প্রতিনিধি | লন্ডন (যুক্তরাজ্য), ১১ জানুয়ারি ২০২৬ : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রবাসী আন্দোলনের পথিকৃৎ, সমাজসেবী, লেখক ও গবেষক নূরুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দিনটি উপলক্ষে দেশে ও প্রবাসে তাঁর সহকর্মী, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছে।

নূরুল ইসলাম ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্যের লন্ডনের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনি, আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

প্রবাসী জীবনের দলিল ‘প্রবাসীর কথা’

দুঃসাহসী সাধক ও গবেষক নূরুল ইসলাম প্রবাসী বাঙালির জীবনসংগ্রামকে লিপিবদ্ধ করে ‘প্রবাসীর কথা’ নামে সহস্রাধিক পৃষ্ঠার একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যা প্রবাসী ইতিহাসের প্রথম ও অন্যতম নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। গ্রন্থটিতে প্রবাস জীবনের সুখ-দুঃখ, অর্জন-বঞ্চনা, সুযোগ-সুবিধা ও সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি স্বদেশের প্রতি প্রবাসীদের দায়বদ্ধতার কথাও গভীর মমতায় উঠে এসেছে।
এই অসামান্য গবেষণা কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ লাভ করেন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি জাতির সংগ্রামমুখর জীবনের ইতিহাস জানতে ‘প্রবাসীর কথা’ আজও অপরিহার্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

প্রবাসে আন্দোলন ও রাজনৈতিক ভূমিকা

ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে নূরুল ইসলাম লন্ডনে অবস্থানকালে তৎকালীন আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাত্র ও প্রগতিশীল মহলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
১৯৬৩ সালে ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অব পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’ গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। এসব সংগঠনের মাধ্যমে প্রবাসে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করতে ১৯৬৬ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এ সময় পাকিস্তান সরকার তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে। ফলে তিনি লন্ডনে ফিরতে না পেরে পড়াশোনায় ব্যাঘাতের সম্মুখীন হন।

পরবর্তীতে তিনি ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের প্রতিনিধি দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ সরকারের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি আব্দুস সামাদ আজাদের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সফর করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।

Manual8 Ad Code

স্বাধীনতা-উত্তর পুনর্গঠন ও প্রবাসী কল্যাণে ভূমিকা
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগ্রহে ইউরোপে তাঁর বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের মাধ্যমে নূরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রবাসী বাঙালিদের কল্যাণে ‘প্রবাসী বাঙালি কল্যাণ বোর্ড’ গঠিত হলে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন হিসেবে নূরুল ইসলাম এই বোর্ডের সচিব নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন।

বিভিন্ন মহলের শ্রদ্ধা

নূরুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমদ বকুল। তাঁরা এক বিবৃতিতে বলেন, নূরুল ইসলাম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবাসী আন্দোলনের এক অনন্য সংগঠক, যার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

এছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামানও পৃথক এক বার্তায় তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

Manual8 Ad Code

স্মরণীয় এক সংগ্রামী জীবন

Manual8 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবাসী আন্দোলনের পথিকৃৎ ও গবেষক নূরুল ইসলামের জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও লেখা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও প্রবাসী বাঙালির অধিকার রক্ষায় অনুপ্রেরণা জোগাবে—এমনটাই মনে করেন তাঁর সহকর্মী ও অনুরাগীরা।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ