সিলেট ১৪ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ : একসময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি কবিতা লিখেছেন, বই প্রকাশ করেছেন, সামাজিক ও জনহিতকর নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন। শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়েও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অথচ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সেই শিক্ষক-কবি শহীদ সাগ্নিক আজ নিজেই অসহায়।
মৌলভীবাজারের কৃতী সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কবি শহীদ সাগ্নিকের প্রকৃত নাম আব্দুস শহীদ। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক বছর ধরে শয্যাশায়ী তিনি। নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে পরিবারের সঞ্চয়। বর্তমানে অর্থাভাবে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। ২০২৫ সালে তাঁর একটি অপারেশনও হয়। অপারেশনের পর নানা জটিলতা দেখা দিলে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিছানায় শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বয়সজনিত নানা সমস্যা এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপনও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
শহীদ সাগ্নিকের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে শিক্ষকতা ও সমাজসেবায়। ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে শমসেরনগর রামচিজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন তিনি। এরপর মৌলভীবাজারের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে ২০০৫ সালে গুঞ্জরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়েও তিনি সক্রিয় ছিলেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষকদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি-দাওয়া ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল ও স্পষ্টভাষী একজন শিক্ষকনেতা।
শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, সাহিত্য অঙ্গনেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ‘শহীদ সাগ্নিক’ নামে তিনি কবিতা লিখতেন। তাঁর একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও জনহিতকর কর্মকাণ্ডে তিনি সরব ছিলেন। এলাকার মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সামাজিক নানা বিষয়ে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা তাঁকে স্থানীয়ভাবে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার বিকাশেও রয়েছে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৯৬৫ সালে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সংস্পর্শে এসে তিনি প্রগতিশীল চিন্তা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানা যায়। পরবর্তী জীবনে মানুষের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণের নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
ব্যক্তিগত জীবনেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল তাঁর বড় স্বপ্ন। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় নিজের সম্পদ বিক্রি করে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে থাকেনি। করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে তাঁরা সেখানে প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পরিবারের সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ জোগাড় করাই পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় শয্যাশায়ী এই শিক্ষক-কবির চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে এখন সমাজের বিত্তবান, সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী শিক্ষক, সাহিত্যপ্রেমী এবং মানবিক মানুষদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জীবনভর যিনি অন্যদের শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন, শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছেন এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজের কথা বলেছেন—আজ সেই মানুষটির নিজের চিকিৎসার জন্য সমাজের মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাতে হচ্ছে।
শহীদ সাগ্নিকের সাবেক শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই মনে করেন, তাঁর এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; এটি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, কবি ও সমাজকর্মীর প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতারও প্রকাশ। তাঁর চিকিৎসা যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সে জন্য ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক সমিতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রবাসী শুভাকাঙ্ক্ষীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট-বড় যেকোনো সহায়তাই এই সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা কামনা করা হয়েছে।
সহায়তা পাঠানোর জন্য দেওয়া হয়েছে—
বিকাশ নম্বর: ০১৮৮৬২৬৩০২২
নাম: মো. সিকান্দর আলী
শহীদ সাগ্নিকের জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি প্রজন্ম তৈরি করেন, সমাজকে আলোকিত করেন। সেই আলোকিত মানুষটির জীবনের কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এখন সমাজের দায়িত্ব।
মানবিক এই আহ্বানে তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী শিক্ষক, শিক্ষক সমাজ, সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
“সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে”—এই মানবিক চেতনায় এগিয়ে এলে হয়তো আবারও চিকিৎসার সুযোগ পাবেন একসময়ের সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও কবি।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি