ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১০: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১০: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

।।|| হাফিজ সরকার ||।।

১৭ এপ্রিল ২০২১ : পর্ব-২ (পুর্বে প্রকাশের পর)
ধারাবাহিক প্রক্রিয়াঃ
ধর্মের ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তানকে ভাষার ভিত্তিতে প্রত্যাখান করে স্বাধীন দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর অর্নিবাচিত এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক বাহিনীর দুই জেনারেল, জিয়াউর রহমান ও হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, সস্তা জনপ্রিয়তার উপকরণ হিসেবে ধর্মকে সামনে নিয়ে এলেন। আর ধর্মের এরূপ রাজনৈতিক ব্যবহারের তাগিদ থেকেই জামাতে ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হলো এবং তারা রাজনৈতিক বৈধতা পেলো। জেনারেল জিয়ার হাত ধরে সংবিধানে ‘বিসমিলস্নাহ’ যুক্ত হলো আর জেনারেল এরশাদের হাত ধরে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম এলো। তবে জিয়া-এরশাদের শাসনাধীন সেই কয়েক বছরে সামরিক ছত্রছায়ায় দেশে যে ধর্মকেন্দ্রিকতা জাঁকিয়ে বসেছিল, সেটা কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পর বন্ধ হয়নি। গণঅভ্যূত্থানে এরশাদ উত্‍খাত হবার পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারাও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধের কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। বরং আশ্চর্য জনকভাবে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছে তারা এবং জামাতিদের দলে ভিড়িয়েছে। এটা হতে পারে যে ১৯৭৫ সালে সৃষ্ট যে ভীতি, সেই ভয়ই তাদের মধ্যে কাজ করতে
পারে অথবা মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার কোটি টাকা কারন হতে পারে। ফলে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সাথে মিলেমিশে চলার এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বড় বড় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ধর্মকে পুঁজি করে যারা রাজনীতি করছে, তাদের সাথে একত্রীত হয়ে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় আসার বা টিঁকে থাকার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং রাজনীতিতে তার প্রভাবঃ
=======

আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার প্রক্রিয়া ২০১৩ সালে জোরদার হয়ে উঠায় এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বেপরোয়া সন্ত্রাস ও সহিংসতায় সারাদেশের সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি – এই দুটো সম্পূর্ন পৃথক বিষয় হলেও বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনে দুটি বিষয় একাকার হয়ে যায়। আসলে বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক জোটে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সোচ্চার হলেও জামায়াতে ইসলামী বরাবরই সামনে এনেছে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিকে। বিএনপি মুখে অন্য কথা বলেও যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামকে বরাবর পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। বিএনপি হরতাল ডেকেছে, অবরোধ কর্মসূচি নিয়েছে অথবা জামায়াতের ডাকা হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিকেসমর্থন করেছে। কিন্তু দীর্ঘকাল মাঠে নামেনি।মাঠে প্রধানতথেকেছে জামায়াত-শিবিরের লোকজন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে জামায়াত ইসলামীর নেতাদের মুক্তিুর দাবিকেবিএনপির এমনতর সমর্থনে জনমনে স্পষ্টতই এই প্রতীতি জন্মেছে যে, বিএনপির রাজনৈতিক এজেণ্ডাকে জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রণ করছে।
অস্থিতিশীল পরিস্থিতিযুদ্ধাপরাধারের বিচারের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সংঘাত ও সংর্ঘষের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। দেশের বড় দুটো দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, এই দুইয়ের মধ্যেকার আদর্শিক পার্থক্য স্পষ্টতর হয়েউঠেছে। রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সন্ত্রাসের ভাষায় রাজনীতি করার চেষ্টাকরা হচ্ছে। সরকারী দল ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক যে ঐক্যমতের রাজনীতি থাকা প্রয়োজন, মুলত তা না থাকায় দেশে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চ :
তরুণ প্রজন্মের জয়রথঃ
==========

একাত্তরের অন্যতম ঘাতক ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার অপরাধ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত হওয়ার পরও তাকে মৃত্যুৃদন্ড না দেওয়ায় ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রম্নয়ারি মুক্তিযূদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে অবস্থান নেয় এবং শুরু

হয় সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে এক নবতর আন্দোলন। কী নামে একে অভিহিত করাযায় : মুক্তিযুদ্ধু ও স্বাধীনতার চেতনার পুনর্জাগরণ? না স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির উত্থান আর আস্ফালনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ? না সরকারী দলের অংশ হিসেবে দলীয় স্বার্থের পাহারা?
নাকি মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার বা বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দুর্নিবার প্রকাশ! কোথা থেকে উত্‍সারিত এই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ তা নির্দিষ্টকরে বলা দুষ্কর৷ তবে একথা অত্যুক্তি নয় যে, এই মঞ্চ মেঘলা আকাশে জ্বলন্ত ধুমকেতুর সঙ্গে তুলনীয়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুনরুন্মেষঃ

৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩-তে মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালের দেওয়া দ্বিতীয় রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয়। এর বিরোধিতাক’রে একদল সোচ্চার তরুণ ব্লগার তাদের প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শাহবাগে জড়ো হয়। কিন্তু এটিকে শুধুমাত্র ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৩-এর কাদের মোল্লার রায়েরই প্রতিবাদ হিসাবে দেখা সমিচীন নয়। মুক্তিযুদ্ধ যেমন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে হঠাত্‍ করে জেগে ওঠা সিদ্ধান্ত ছিল না; গণজাগরণ মঞ্চও তেমনি শুধুমত্র একটি নির্দিষ্ট রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয় – ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ একটি সন্ধিক্ষণ, যে ক্ষণে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা তরুণ প্রজন্ম তাদের অন্তরে জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে দিয়ে তারা যে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে সেটি হ’ল অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রত্যাশা।

গণজাগরণ মঞ্চ কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নয়, বরং রাজনৈতিক ভাবে সচেতন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিষয়কে রাজনৈতিক ভাবে মীমাংসা ক’রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ভেদে সকলের সমানাধিকারের দেশ গঠনের সোচ্চার আহ্বান। বাঙালীর অন্যতম বৈশিষ্ট অসাম্প্রদায়িকতা ও উদারতা যা হাজার বছর ধরে বাঙালী ধারণ ও লালন করে আসছে। এ বৈশিষ্ট্য পাকিস্তান-চেতনার পরিপন্থি হওয়ার কারণেই ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান এর বিরোধীতা করে আসছে। এর সর্বাত্বক প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের উপর বর্বরোচিত নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাই এদেশের মাটিতে রাজাকার-আলবদর নামক মৌলবাদী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা অসাম্প্রদায়িকতাকে নস্যাত্‍ করতে পাকিস্থান বাহিনীর দোসরে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়কে একটি কৌশলগত পশ্চাদাপসারণ হিসেবে ধরে নিয়ে এক নতুন আঙ্গিকে নতুন শক্তিতে নিজেদের তারা বিন্যস্ত করেছে। এ শক্তি তাদের উগ্র ও মৌলবাদী চিন্তাধারাকে জোর পূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াসের মাধ্যমে, এদেশের মানুষের সহজাতধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করে, জাতীয় উন্নয়নকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করে চলেছে। এজন্য এ শক্তি হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য(Target) করে তাদের মুক্ত-চিন্তার বিকাশকে ব্যাহত করে মৌলবাদী ভাবধারায় রূপান্তরের জন্য এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তারই বিরুদ্ধে স্বাধীন দেশের মুক্তিসংগ্রামের চেতনাধারী তরুণ প্রজন্ম মাথা তুলে দাঁড়িয়েছ। গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিটি শ্লোগানে ও বক্তব্যে এককব্যক্তি-মানস থেকে শুরু সকল রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংগ ও সংগঠনসহ সকলকে
নতুনভাবে রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্য ও চেতনার দিকে ফিরে তাকানোর পরোক্ষ নির্দেশনা রয়েছে – এটিই এই তরুণ প্রজন্মের নেতৃবৃন্দের নতুন দিক এবং একই সাথে জাতীয় স্বার্থের জন্যও এটি একটি শুভ দিক বলেই প্রতীয়মান হয়। তরুণ প্রজন্মের লালিত স্বপ্ন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার তাগিদ – যা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অসম্পন্ন রয়ে গেছে। সেই অসম্পন্নতার হোতা মুষ্ঠিমেয় পাকিস্তানপন্থী ধ্যানধারণার অনুসারী ব্যক্তি ও মৌলবাদী-সাম্রাজ্যবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে এই জাগরণকে, তরুণ প্রজন্মের এ নেতৃত্বকে, স্বাগত জানানো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষের দায়িত্ব।

দ্বিতীয় রেনেসাঁঃ

অপরিসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের অর্থাত্‍ দ্বিতীয় মুক্তি -সংগ্রামের প্রথম শহীদ রাজীব। রাজীব হত্যা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, এতে কোন সন্দেহ নেই। রাজীব তো ছিলেন একজন ব্লগার, ব্লগার মানে হ’ল একজন লেখক। তাঁর লেখার মাধ্যমটা ভিন্ন, তবে লেখক হিসেবে তিনি একজন বুদ্ধিজীবী অবশ্যই। তাই এটি বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের অংশ। একাত্তরে যেভাবে বুদ্ধি জীবী হত্যাকরেছে, আবারও সেই একইভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয়েছে। চলেছে মাঝখানেও, কবিশামসুর রাহমানের উপর হামলা হয়েছে, হুমায়ন আজাদের উপর হামলা হয়েছে, সেগুলো মনেআছে আমাদেও; কিন্তু আহমেদ রাজীব হায়দার জীবন দিয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে নাম লেখালেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা একটি অসাধারন কাজ করেছেন এবং
করছেন। আন্দোলন শুরুর দেড়মাস আগে থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সচেতনতা যে পর্যায়েউন্মীত হয়েছিল বহু রাজনৈতিক বক্তৃতা কিন্তু সেটা করতে পারেন নি। আসলে রাজনৈতিকআন্দোলন তো জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়, এবংএই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সফলতম ক্লাসগুলো আমরা ঐ দেড় মাসে দেখেছি। রাজপথে, উন্মুক্ত আকাশের নীচে, সেই
ক্লাসগুলো হয়েছে – অসাধারণ সব ক্লাস। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা বাংলার দ্বিতীয় রেনেসাঁ। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় যে রেনেসাঁ আমরা দেখেছিলাম – যেটাকে অনেকে অসমাপ্ত রেনেসাঁ বলেন, আমার মনে হচ্ছে সেই রেনেসাঁ ভবিষ্যতে একটা সমাপ্তির দিকেযাবে। রেনেসাঁ তো ছিল মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক জীবনাচরণ এবং ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তির পথ, মানুষকে ইহজাগতিকতা শেখানো, মানুষকে মুক্তভাবে ভাবতে শেখানো এবং ঈশ্বরতত্ত্বের বাইরে বেরিয়ে মানুষকে যুক্তির উপর দাড়ঁ করানো। সেই ঘব্যাপারগুলো এখানেও কিন্তু সমভাবে কার্যকর। এই আন্দোলনের শহীদ রাজীব হায়দার এবং তার বন্ধুরা এই রেনেসাঁর একেকজন অগ্রদূত।

শহবাগ হোক রাজীব স্কোয়ারঃ

১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানে যেভাবে শহীদ আসাদ জীবন দিয়ে আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন – সর্বত্র আসাদের নাম ছড়িয়ে গেছে, আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে আসাদের নাম যেমন আমাদের জড়িয়ে রেখেছে – তেমনি হওয়া উচিত রাজীব-এর নাম। শাহবাগ স্কোয়ারের নামটা বদলে রাজীব স্কোয়ার করা যেতে পারে।

নবজাগরণের আদর্শিক ভিত্তিঃ

প্রত্যেক আন্দোলনের একটা আদর্শিক ভিত্তিভূমি থাকে। এই আন্দোলনেরও একটা জোরালো আদর্শিক ভিত্তিভূমি আছে। সেটা প্রতিফলিত হয়েছে শাহবাগ মোড়ে আন্দোলন মঞ্চের মাথার উপরে রক্ষিত জাহানারা ইমামের প্রতিকৃতি থেকে। জাহানারা ইমামের যে আন্দোলন, সেকুলারিজিমের জন্য যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রাম ছিল অসাম্প্রদায়িক একটা সমাজ গড়ার রাষ্ট্রগড়ার সংগ্রাম। এই প্রজন্মের তরুণরা সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে বহন করছেন। এই যেসেকুলারিজমের আন্দোলন – এতে আন্দোলনকারীরা যখন
“ বলে যে কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই – তার মানে দাঁড়ায় যে তারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান চায়।
“ তারা দাবী করে যে জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক, তখন তারা বলে যে এ দেশেধর্ম-ব্যবসার রাজনীতি করা যাবে না।“ তারা বলে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের কোন ভূমিকা থাকবে না, এর মানে হচ্ছে ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়, ধর্মের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোন ভূমিকা রাখবে না, সকলধর্মের সমান অধিকার।

অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্তঃ

ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করার কাজটা রেনেসাঁ করেছিল। ইউরোপে ৪০০ বছর আগে যেটা ফয়সালা হয়েছে সেটা আমাদের দেশে আমরা এখনও করতে পারিনি। সেই কাজগুলো কিন্তু এই আন্দোলনকারীরা করছেন – সেদিক থেকে এটা একটা জোরালো বিষয়-ভিত্তিক
আন্দোলন। আমরা সমসাময়িক কালে বা নিকট অতীতে যে আন্দোলনগুলো দেখেছি সেই আন্দোলনগুলোর সাথে তুলনা করতে গেলে কোন কোন দিক থেকে এ আন্দোলনের সঙ্গে মিল আছে, আবার কোন কোন দিক থেকে একটা সুনির্দিষ্ট স্বাতন্ত্র চোখে পড়ে। তাহ্‌রির স্কোয়ারে যে
পরিসর ছিল এই আন্দোলনের পরিসর তার চেয়ে অনেক বেশি। তাহ্‌রির স্কোয়ারে উপস্থিতি অনেক সময় কমে এসেছে, অনেকসময় খুব ছোট হয়ে এসেছে, আবার বেড়েছে; কিন্তু এখানে ক্রমাগতভাবে প্রায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

এখানেই শেষ নয়ঃ

আসলে এটি একটি বিকেন্দ্রিভূত সামাজিক আন্দোলন; একক নেতৃত্ব নেই, কিন্তু এখানে নেতৃত্ব তো আছে। চমত্‍কার নেতৃত্ব আছে, এবং এ নেতৃত্ব থেকে কর্মসচিূ আসছে একের পর এক। একটি ‘কোর’ গ্রুপ গঠিত হয়েছে এবং সেই কোর গ্রুপ নিয়মিত বসেছে এবং তারা কর্ম-পরিকল্পনাগ্রহণ করেছে, জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে। আর একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট হ’ল রাজনৈতিক
সচেতনতার সাথে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিথস্ক্রিয়া। সমসত্ম বিদ্যালয়, মাদ্রাসা-সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন, এটি অসাধরণ। আমরাজানি যে, আমাদের দেশে অনেক স্কুলে এবং মাদ্রাসায় এখন পর্যন্ত জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়না, জাতীয় পতাকা তোলা হয় না। সেই বিদ্যাপিঠগুলোতে এ কর্মসচিূ পালিত হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে একটা চমত্‍কার সোশ্যাল ক্যাপিটাল গড়ে উঠেছে। এবং দেখা যাবে এই সোশ্যাল ক্যাপিটাল এই ইস্যুতে নিশ্চয়ই জয়যুক্ত হবে। এই যে দাবি নিয়ে তারা এখানে একত্রিত হয়েছে, ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবী, যুদ্ধা পরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী, জামাতকে নিষিদ্ধ করার দাবী – সেটা নিশ্চয়ই অর্জিত হবে, এটা এখানে থেমে যেতে পারে না।

নেতৃত্ব আছে কিন্তু দল নেইঃ

এই যে সমবেত শক্তি গড়ে উঠেছে, শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে, এই সমবেত শক্তি আগামীতেসমাজের যে কোন অন্যায়, যে কোন অবিচার, যে কোন অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
এখানে আর একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হ’ল, গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি আছে কিন্তু দল নেই, দলের কর্তৃত্ব নেই, রাজনৈতিক ইস্যু আছে, রাজনীতিও হচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলের বাইরেও – এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দলের কাছে সতর্কবার্তাঃ

তবে রাজনৈতিক দলের কোন বিকল্প নেই, রাজনৈতিক দলকে তার ভূমিকা রাখতে হবে একথা অনস্বিকার্য, কিন্তু এটিও সত্য যে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের জন্য এটি একটি বড় রকমের শিক্ষা নেওয়ার ঘটনা এবং সময়। বিশেষ করে বলা যায় বিরোধীদলের কথা। প্রধান বিরোধী দল, বিএনপি, প্রথম দিকে নিশ্চুপ ভূমিকায় থেকে শেষাবধি মৌলবাদী জামাত-শিবিরের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বিএনপি’র জামাতকে নিয়ে পথ চলা আজকের প্রজন্মসহ আপামর জনগণ কিভাবে গ্রহণ করবে তার অনুধাবন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বর্তমানেক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা।

হুঁশিয়ারিঃ

আওয়ামী লীগ যেন সাম্প্রদায়িক কোন অপশক্তির সাথে কোন রকমের কোন সমঝোতার চেষ্টানা করে, এ মঞ্চ তাদের জন্যও একটা হুশিয়ারি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমীপে এ কথাবলা যায় যে, তাঁর বোধোদয় হতে এত সময় লাগছে কেন? জামাত যে কোন গণতান্ত্রিক দল নয় – এটা কী কোন নতুন কথা? ১৯৭১ কি তার যথেষ্ট প্রমাণ নয়? ৭১-পরবর্তীতে যে রগকাটার রাজনীতি শুরু হয়েছিল, বিভিন্ন সময়ে যে হত্যার রাজনীতি জামায়েত করেছে,একবার দুবার নয় বারবার তারা করছে – এই বিষয়টি তো প্রমাণিত। যে কথা আজ আমাদের তরুণরা বলছে, জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে, তা বাস্তবায়ণের জন্য আর কী প্রমাণ দরকার? এর বিরুদ্ধে যে জনমত আছে, জন-রায় আছে – সেটা আর কীভাবে প্রমাণ করলে সরকার বুঝবে রাষ্ট্র
বুঝবে জামাত-শিবির নিষিদ্ধের সুসময় উপস্থিত!

আজও পথ দেখায়ঃ

গনজাগরণ মঞ্চে যে শুধু দলভুক্ত মানুষ অংশগ্রহণ করছেন তা নয়। প্রত্যক্ষ দলভুক্ত মানুষরয়েছেন, দলের বাইরের মানুষের অংশ গ্রহণও ব্যাপক। সুতরাং তরুণ প্রজন্ম এক মহা জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আসলে ১৯৭১-এ যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল – সেখানে বঙ্গবন্ধুছিলেন, মাওলানা ভাসানী ছিলেন, কমরেড মনি সিং ছিলেন, কর্ণেল তাহের ছিলেন, রাশেদ খান মেনন-সহ অনেকেই সেই ঐক্যে শরিক হয়েছিলেন। সর্বোপরি ছিলেন গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়ামানুষ। শতকরা ৮৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কৃষক বা কৃষক পরিবারের সন্তান। শহবাগকে কেন্দ্র করে আবার সে ঐক্য গড়ে উঠেছে। এই আন্দোলনে যদিও ব্যাপক সংখ্যায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহন চোখে পড়েনি – কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক ছাত্র, ব্যাপক সংখ্যক সাধারণ মানুষ- বিশেষত: শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটেছে। এটি প্রত্যাশা করা যায় যে, এই আন্দোলনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবে এবং ক্রমশ সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে। তাই এই জাগরণ আজও পথ দেখায়।

সংগ্রহ ও সম্পাদনাঃ
হাফিজ সরকার।