সৌদির উদ্যোগে নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ বাসদের

প্রকাশিত: ৭:৫৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২৬

সৌদির উদ্যোগে নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ বাসদের

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০১ আগস্ট ২০২৬ : বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা এক বিবৃতিতে বলেন- “গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে রিয়াদে এক বৈঠকে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ ঘোষণা করে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫১টি দেশকে বৈঠকে ডেকেছিল। এরমধ্যে অংশ নিয়েছে ৪৩টি দেশ। ৪৩টি দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ও বিবৃতি দিয়ে জোটটিকে সমর্থন জানিয়েছে মাত্র ১৪টি দেশ। এশিয়া মহাদেশ থেকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে মাত্র দুইটি দেশ- বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। এই জোটের ঘোষিত লক্ষ্য হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর -এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এই বাব আল-মান্দেব প্রণালীর উপর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের প্রায় ৬১% রপ্তানি (মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী) ও প্রায় ৮% আমদানি এই একই রুট ব্যবহার করে আসে। যদি বাব আল- মান্দেব বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অধিকাংশ জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের Cape of Good Hope ঘুরে যেতে হয়। এর ফলে যাত্রাপথ সাধারণত ১০-১৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে জ্বালানি ব্যয় ও বীমা খরচ বাড়ে, কন্টেইনার ভাড়া বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অনেকখানি পিছিয়ে পড়বে।

Manual7 Ad Code

একথা যেমন সত্য তেমনি এও সত্য যে, এই সংকট বাংলাদেশের একার নয়। সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হওয়ায় এটি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যকার আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। এই অংশের নিরাপত্তা নিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ৩০-৩৫টি দেশই চিন্তিত। ফলে এই রুটকে নিরাপদ রাখার জন্য নানা ধরনের সামরিক জোট এরইমধ্যে গড়ে উঠেছে ও ক্রিয়া করছে।
এছাড়া যে ১০/১২টি দেশের অস্তিত্ব ও অর্থনীতি এই অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল- তাদের সকলে এই নিরাপত্তা জোটভুক্ত হয়নি। আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৮টি দেশ বৈঠকে উপস্থিত হয়নি, উপস্থিত দেশগুলোর মধ্যে ২৯টি দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, চুক্তিকে সমর্থন করে প্রেস কনফারেন্সেও অংশ নেয়নি। সেখানে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া একটা বিস্ময়কর ঘটনা।

Manual3 Ad Code

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর সম্পর্ক বাংলাদেশের চেয়ে কম নয়। ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৮০% (বিশেষ করে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে) এই করিডোরের সাথে সংযুক্ত। তারপরও ভারত এই জোটকে সমর্থন দেয়নি। শুধু ভারত নয়- চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), ওমান, অধিকাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র (যদিও EU প্রতিনিধি বৈঠকে ছিল) এই বৈঠকে যোগ দেয়নি।

Manual1 Ad Code

সৌদি আরব এই নিরাপত্তা জোট তৈরি করতে চাইছে কেন- সেই বিষয়টিও গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার আছে বলে আমরা মনে করি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ রুট – হরমুজ প্রণালী ও বাব-আল মান্দেব প্রণালীর মধ্যে হরমুজই দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের প্রধান জ্বালানি রুট ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফলে এই পথের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর-বাব আল-মান্দেব করিডোরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।

কিন্তু ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইতোমধ্যে এই প্রণালীতে সৌদি জাহাজে হামলা করেছে ও নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সৌদি আরব এই ঘটনাকে সামনে রেখে এই জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়। সৌদি আরব হুথিদের হাত থেকে এই প্রণালী রক্ষার কথা বলে নিরাপত্তা জোট গঠনের কথা বললেও তাদের উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত ও গভীর বলেই অনেকে ধারণা করেন। কারণ সামরিক জোট কোন স্বাভাবিক বিষয় নয়। উপরন্তু এই অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে Prosperity Guardianও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বে Operation Aspides- নামে দুইটি সামরিক উদ্যোগ ক্রিয়াশীল আছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এরপরও সৌদি আরব আলাদাভাবে কেন এই উদ্যোগ নিল- এই প্রশ্নটিকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে।

Manual3 Ad Code

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এই অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বহন করতে হচ্ছে বলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সেটা যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই বাস্তবায়িত হবে- এ ধরনের কথাবার্তা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরান যুদ্ধের ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে আমেরিকায় মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিক্ষোভ হচ্ছে, অন্যদিকে টানা যুদ্ধে অস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ায় বাড়তি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জন্য কংগ্রেসে প্রস্তাব তুলতে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। বিরোধীরা এ নিয়ে ট্রাম্পকে তুলোধুনো করছে। এই সমগ্র পরিস্থিতি এবং সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এই প্রতিরক্ষা জোট গঠনের সাথে সম্পর্কিত।

এই দীর্ঘমেয়াদী আশঙ্কার সাথে একটা আশু সংকটকেও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই নিরাপত্তা জোটে যোগ দিয়ে হুথিদের সাথে প্রক্সি ওয়ারে জড়িয়ে পড়ার আগে যে কোন দেশই একাধিকবার ভাববে।

ধারণা করা যায়, এই সকল কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, আমিরাতসহ এই রুটের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, একইসাথে আমেরিকারও ঘনিষ্ঠ মিত্র- এরকম দেশই এ বিষয়ে এখনও নিরপেক্ষ বা পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেখানে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় শক্তিশালী অনেক দেশই পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়- সেখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল সামরিক সক্ষমতার বাংলাদেশ কেন এ ধরনের জোটে যুক্ত হলো, এটা একটা বড় প্রশ্ন। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনই কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়নি, যদিও নানা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন দেশের চাপ ছিল। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভঙ্গ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নানামুখী সংকটের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ কেন সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলো, তার সদুত্তর নেই।

সরকার কোন সিদ্ধান্তই পরিষ্কার করছেন না। একটা সক্রিয় সংসদ থাকার পরও সেখানে এইসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে তো আলোচনা হচ্ছেই না, এমনকি নিরাপত্তা জোটে যোগদানের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের সংবাদও ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর পত্রিকা মারফতে জানতে হচ্ছে। সংসদে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি কোন আলোচনা তুলছেন না, আলোচনা দাবিও করছেন না। নির্বাচনের আগেই দেশীয় শিল্পপতিগোষ্ঠী ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে মুচলেকা দিয়ে বড় বড় দল সংসদে প্রবেশ করেন- এই প্রচলিত সত্য কথাকে এত নগ্নভাবে প্রমাণ করার মতো সংসদ অন্তত জুলাই গণঅভ্যুত্থান চায়নি।

আমরা অবিলম্বে এই বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করছি ও সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে একে আলোচনায় আনার জন্য আহবান করছি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ