সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহিতাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি

প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২৬

সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহিতাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি

Manual2 Ad Code
  • ঢাবি সাংবাদিকতা বিভাগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেমিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০২ আগস্ট ২০২৬ : রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার সম্পর্ক দিন দিন আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতার চর্চাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা।

তারা বলেছেন, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনস্বার্থ রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, তথ্যপ্রবাহের বিস্তার এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও সাংবাদিকদের সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।

রোববার (২ আগস্ট ২০২৬) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন প্রধান অতিথি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

Manual8 Ad Code

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সাংবাদিকতার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাকে সর্বজনীন কল্যাণের দিকে পরিচালিত করা সময়ের দাবি। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব সত্য উদ্ঘাটন এবং তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপন। তবে সেই প্রক্রিয়াও হতে হবে নীতিনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক। তিনি বলেন, “সত্য উদ্ঘাটন ও বস্তুনিষ্ঠতা সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”

Manual5 Ad Code

তিনি আরও বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংবাদ পরিবেশনের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার। তাই সাংবাদিকদের আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি। সাংবাদিকরা সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে দেশ ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। নিষ্ঠা, সততা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীরা সমাজে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ সাংবাদিক, গবেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তৈরি করে আসছে। নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তোলার মাধ্যমে বিভাগটি ভবিষ্যতেও দেশের গণমাধ্যম খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেমিনারের মুখ্য আলোচক সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর তাঁর আলোচনায় রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সাংবাদিকতার পারস্পরিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক ও বাস্তব দিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি সমকালীন গণমাধ্যমের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে পরিবর্তিত প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ, সংবাদ উৎপাদন ও প্রচারের নতুন বাস্তবতা নিয়েও তিনি আলোচনা করেন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ৬৪ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দেশের গণমাধ্যম ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাত্ত্বিক জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পেশাগত নৈতিকতার সমন্বয় প্রয়োজন। এ ধরনের একাডেমিক আয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যম পেশাজীবীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করে।

Manual2 Ad Code

সেমিনারে বক্তারা আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে সাংবাদিকতার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

Manual6 Ad Code

আলোচনা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারীরা সমসাময়িক সাংবাদিকতার নানা দিক নিয়ে মতামত ও প্রশ্ন তুলে ধরেন। বক্তারা সেগুলোর উত্তর দেন এবং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দেশের সাংবাদিকতা শিক্ষা, গবেষণা ও গণমাধ্যম উন্নয়নে অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে।