সিলেট ৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৩৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২৬
এক
কাল্পনিক সমাজতন্ত্র:
স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব”(১)-এই শ্লোগান দিয়ে সামন্তবাদ বিরোধী বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিনতিতে যখন শোষণ, বঞ্চনার অবসান হলো না, এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিভিন্ন কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদ দেখা দেয়।
প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার সংগ্রামের অপরিনত যুগে প্রকৃতপক্ষে যাকে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট মতাদর্শ বলা চলে সেই সা সিমো (১৭৬০-১৮২৫), চার্লস ফুরিয়ে (১৭৭২-১৮৩৭), রবার্ট ওয়েন (১৭৭১-১৮৫১) ইত্যাদির মতবাদ সামনে আসে।
এই সব কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী মতের প্রতিষ্ঠারা শ্রেণি বিরোধ ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিধ্বংসী উপাদানগুলির ক্রিয়াটা দেখেছিলেন। কিন্তু প্রলেতারিয়েত তখনও তার শৈশবে; এদের চোখে বোধ হল যে শ্রেণির নিজস্ব ঐতিহাসিক উদ্যম এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন নেই।
যন্ত্রশিল্প প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রেণি বিরোধ বাড়লেও সেদিনের অর্থনৈতিক অবস্থা তখনো এদের সামনে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির বৈষয়িক শর্তগুলি তুলে ধরেনি। ফলে এঁরা নিজেরাই খুঁজতে শুরু করে দেয় সে শর্ত সৃষ্টি করার মতো নতুন সমাজবিজ্ঞান, নতুন সামাজিক নিয়ম।
এসব কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনীতির গতির নিয়ম, সমাজের দ্বন্দ্বগুলো এবং শ্রেণী-সংগ্রামের নিয়ম বুঝতে ব্যর্থ হয়ে বুর্জোয়াদের কাছে আবেদন, ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত স্থাপন ইত্যাদি সংস্কারমূলক পন্থা তুলে ধরেন। যেমন ওয়েন তাঁর আদর্শ কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলিকে ‘হোম কলোনি’ বলতেন; ফুরিয়ের কল্পিত সমাজতন্ত্রী উপনিবেশের সর্বভোগ্য প্রাসাদের নাম ‘ফালানস্টের’। আমেরিকাস্থিত যে ইউটোপীয় কল্পরাজ্যের কমিউনিস্ট উপনিবেশ কাবে বর্ণনা করেছিলেন, তারই নাম ‘আইকেরিয়া’।(২)
ভবিষ্যৎ সমাজের এ ধরনের উদ্ভট ছবি আঁকা হয় এমন সময়ে যখন প্রলেতারিয়েতের অতি অপরিনত অবস্থার মধ্যে ছিল। নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তাদের ধারণাও ছিল উদ্ভট; সমাজের ব্যাপক পুনর্গঠন সম্বন্ধে এ শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এ ধরণের ছবির মিল দেখা যায়।
‘কিন্তু সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট এই সব লেখার মধ্যে সমালোচনামূলক একটা দিকও আছে। বর্তমান সমাজের প্রত্যেকটি নীতিকে এঁরা আক্রমণ করল। তাই শ্রমিক শ্রেণির জ্ঞান লাভের পক্ষে অনেক অমূল্য তথ্যে তা পরিপূর্ণ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে প্রভেদ, পরিবার প্রথা, ব্যক্তি বিশেষের লাভের জন্য শিল্প পরিচালনা ও মজুরি শ্রমের উচ্ছেদ, সামাজিক সৌষম্য ঘোষণা, রাষ্ট্রের কাজকে কেবলমাত্র উৎপাদনের তদারকে রূপান্তরিতকরণ ইত্যাদি যেসব ব্যবহারিক প্রস্তাব এই লেখার মধ্যে আছে তাদের সবকটাই শ্রেণিবিরোধের অন্তর্ধানের দিকেই কেবল অঙ্গলি নির্দেশ করে, অথচ সে বিরোধ সেদিন সবেমাত্র মাথা তুলছিল, এই সব লেখার মধ্যে ধরা পড়েছিল তাদের, আদি অস্পষ্ট অনির্দিষ্ট রূপটুকু। প্রস্তাবগুলির প্রকৃতি তাই নিতান্তই ইউটোপীয়।
…এই সমস্ত মতবাদের প্রবর্তকেরা অনেক দিক দিয়ে বিপ্লবী হলেও তাদের শিষ্যরা প্রতিক্ষেত্রে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীতেই পরিনত হয়েছে। প্রলেতারিয়েতের প্রগতিশীল ঐতিহাসিক বিকাশের বিপরীতে তারা নিজ নিজ গুরুর আদি মতগুলিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাই তাদের অবিচল চেষ্টা যেন শ্রেণি-সংগ্রাম নিস্তেজ হয়ে পড়ে, যেন শ্রেণিবিরোধ আপসে মিটে যায়। তারা এখনও তাদের সামাজিক ইউটোপিয়ার পরীক্ষামূলক রূপায়ণের স্বপ্ন দেখে; বিচ্ছিন্ন ‘ফালানস্টের’ প্রতিষ্ঠা, ‘হোম কলোনি’ স্থাপন, ‘ছোট আইকেরিয়া’ প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখে,নব জেরুজালেমের ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে;- আর এই আকাশকুসুম বাস্তব করার জন্য আবেদন জানায় বুর্জোয়া শ্রেণির সহানুভূতি ও টাকার থলির কাছে।’(৩)
এসব কাল্পনিক মতবাদসমূহ সম্পর্কে লেনিন লিখছেন,‘ভূমিদাস প্রথার পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই একথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, মেহনতি মানুষদের ওপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হল এ মুক্তির অর্থ। সে পীড়নের প্রতিফলন ও প্রতিবাদ স্বরূপ নানাবিধ সমাজতান্ত্রিক মতবাদ অবিলম্বে দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু এই সব আদিম সমাজতন্ত্র ছিল ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, নিন্দা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে তার বিলুপ্তির, উন্নতর এক ব্যবস্থার কল্পনায় মেতেছে, আর ধনীদের বোঝাতে চেয়েছে শোষণ নীতিবিগর্হিত কাজ।
কিন্তু সত্যিকারের উপায় দেখাতে ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র পারেনি। পুঁজিবাদের আমলে মজুরি দাসত্বের সারমর্ম কী তা সে বোঝাতে পারেনি, পুঁজিবাদের বিকাশের নিয়মগুলি কী তাও সে আবিষ্কার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি সেই সামাজিক শক্তি যা নতুন সমাজের নির্মাতা হবার ক্ষমতা ধরে।
ইতিমধ্যে সমাজতন্ত্র, ভূমি দাসত্বের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের সর্বত্র এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে যেসব উত্তাল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরোত্তর পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, শ্রেণিসমূহের সংগ্রামই হল সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।
মরিয়া প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ভূমিদাস মালিকশ্রেণির ওপর রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি বিজয়লাভও সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম বিনা কোনো পুঁজিবাদী দেশই ন্যুনাধিক মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।’(৪)
লেনিন মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘মার্কসের প্রতিভা এইখানে যে, এ থেকে তিনি সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন ও তাকে সুসঙ্গতরূপে বিকশিত করেন, যা পাওয়া যায় বিশ্ব ইতিহাসের শিক্ষা থেকে। সে সিদ্ধান্ত হল শ্রেণি সংগ্রামের মতবাদ। যেকোনো নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে রাজনীতির ক্ষেত্রে চিরকাল প্রতারণা ও আত্মপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়ে ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়ন প্রবক্তারা সর্বদায় বোকা বনবে যদি তারা একথা না বোঝে যে, যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন, প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে। এবং এই সব শ্রেণির প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায় আছে: যে শক্তি পুরনোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে — এবং নিজের সামাজিক অবস্থানহেতু যা তাকে করতেই হবে – তেমন সব শক্তিকে আমাদের চারপাশে সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে দীক্ষিত ও সংগ্রামের জন্যে সংগঠিত করে তোলা। যে মানসিক দাসত্বের মধ্যে নিপীড়িত শ্রেণিগুলির সকলে এতদিন বাঁধা পড়ে ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রলেতারিয়েত পেয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ থেকে। একমাত্র মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বেই ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে সাধারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের সত্যিকারের অবস্থাটা কী? আমেরিকা থেকে জাপান এবং সুইডেন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, সারা দুনিয়া জুড়ে প্রলেতারিয়েতের স্বতন্ত্র সংগঠনের সংখ্যা বাড়ছে। নিজেদের শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে শিক্ষিত ও দীক্ষিত হয়ে উঠছে প্রলেতারিয়েত, বুর্জোয়া সমাজের কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উঠছে, ক্রমেই নিবিড় হয়ে জোট বাঁধছে,শিখছে কী করে নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান করতে হয়, আপন শক্তি সমূহকে তারা পোক্ত করে তুলছে এবং বেড়ে উঠছে অপ্রতিহতভাবে।’(৫)
পুঁজিবাদী সমাজ থেকে সমাজতন্ত্রী সমাজে রূপান্তর যে অবশ্যম্ভাবী এ সিদ্ধান্ত মার্কস পুরোপুরি ও একমাত্র টেনেছেন পুঁজিবাদী সমাজ বিকাশের অর্থনৈতিক নিয়ম থেকেই। শ্রমের যে সামাজিকরণ হাজারো রূপের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত দ্রুত এগিয়ে চলেছে এবং সাম্রাজ্যবাদী যুগে ফিনান্স পুঁজির পরিমাণ ও ক্ষমতার প্রচণ্ড বৃদ্ধির মধ্যে যা বিশেষ স্পষ্ট করে আত্মপ্রকাশ করছে, তাই হল সমাজতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী অভ্যুদয়ের প্রধান বৈষয়িক বুনিয়াদ। এ রূপান্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক চালিকাশক্তি এবং বাস্তব কর্মকর্তা হল প্রলেতারিয়েত, পুঁজিবাদই তাদের শিক্ষিত করে তোলে। বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম নানাভাবে এবং উত্তরোত্তর সারসমৃদ্ধ রূপ নিয়ে অপরিহার্যভাবে পরিনত হয় এক রাজনৈতিক সংগ্রামে, প্রলেতারিয়েত কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকারই যার লক্ষ্য অর্থাৎ প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। উৎপাদনের সামাজিকরণ – উৎপাদনের উপকরণসমূহকে সামাজিক সম্পত্তিতে পরিণত না করে, ‘উচ্ছেদকারীদের উচ্ছেদ’ না ঘটিয়ে পারে না। এরূপ পরিনতির প্রত্যক্ষ ফল হবে শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রভূত বৃদ্ধি, শ্রমদিনের হ্রাস, আদিম প্রকৃতির ছোট ছোট বিখন্ডিত উৎপাদনের সমস্ত জের, সমস্ত ধ্বংসস্তুপের স্থানে যৌথ ও উন্নতর শ্রম। কৃষি ও শিল্পের যোগাযোগ পুঁজিবাদের ফলে চূড়ান্তভাবে ছিন্ন হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার উচ্চতম বিকাশের ফলে বিজ্ঞানের সচেতন প্রয়োগ, যৌথ পরিশ্রমের প্রনালী এবং জনসংখ্যার পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে তা গড়ে তোলে এই বন্ধনের, শিল্পের সঙ্গে কৃষির মিলনের নতুন উপকরণ (এই পুনর্বিন্যাসে যেমন গ্রামাঞ্চলের দূরত্ব, বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা ও বন্যতা তেমনি বড় বড় শহরের বিপুল জনসংখ্যার অস্বাভাবিক পুঞ্জীভবনের অবসান হবে)। পরিবারের নতুন রূপ, নারীদের অবস্থা এবং নবীন পুরুষদের মানুষ করে তোলার নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে আধুনিক পুঁজিবাদের উচ্চতর রূপ: নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের শ্রম, পুঁজিবাদ কর্তৃক পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের ভাঙ্গন বর্তমান সমাজে অনিবার্যভাবেই অতি ভয়াবহ, বিপর্যয়কর ও জঘন্য রূপ নেয়।’(৬)
কিন্তু তাহলেও ‘বৃহৎ শিল্প নারী, কিশোর, বালক বালিকাদের ওপর তাদের গার্হস্থ্য জীবনের বাইরে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারক ভূমিকা অর্পণ করে পরিবার ও নরনারী সম্পর্কের একটা উচ্চতর রূপের নতুন অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলে।বলা বাহুল্য, পরিবারের খৃষ্টীয় জার্মান রূপটিকে অথবা প্রাচীন রোমক, প্রাচীন গ্রিক, কিংবা প্রাচ্য দেশীয় রূপকেই পরম গণ্য করা সমান বিদঘুটে, প্রসঙ্গত, পরস্পর যোগাযোগে এরা হল ঐতিহাসিক বিকাশধারা।এ কথা পরিষ্কার যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত কদর্য পুঁজিবাদী রূপের ক্ষেত্রে, যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্যে শ্রমিকের অস্তিত্ব, শ্রমিকের জন্যে উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, সেখানে নরনারী উভয়কে নিয়ে সকল বয়সের লোক মিলিয়ে সমষ্টিকৃত শ্রমিকবাহিনী গঠন — ধ্বংস ও দাসত্বের সংক্রামক জন্মস্থল, — উপযুক্ত অবস্থায় অবধারিতভাবেই তা বরং মানবোচিত বিকাশের উৎস হতে বাধ্য।’(৭)
ফ্যাক্টরি ব্যবস্থায় দেখি ‘ভবিষ্যৎ যুগের শিক্ষাব্যবস্থার বীজ, যখন নির্দিষ্ট বয়সের পরে সব ছেলেমেয়ের জন্যেই উৎপাদন-শ্রমের সঙ্গে বিদ্যাশিক্ষা ও শরীরচর্চার মিলন ঘটবে, আর সেটা সামাজিক উৎপাদন বাড়াবারই একটা উপায় হিসেবে মাত্র নয়, সর্বাঙ্গীন বিকশিত মানুষ গড়ে তোলার একমাত্র পদ্ধতি হিসাবেও’।(৮)
জাতির ও রাষ্ট্রের প্রশ্নটিকেও এই একই ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড় করায় মার্কসের সমাজতন্ত্র এবং তা শুধু অতীতকে ব্যাখ্যা করার দিক থেকে নয়, নির্ভয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে সে ভবিষ্যৎ রূপায়িত করার লক্ষ্যে সাহসী ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপের দিক থেকেও। সামাজিক বিকাশে বুর্জোয়া যুগের একটি অবশ্যম্ভাবী ফল ও একটি অবশ্যম্ভাবী রূপ হল জাতি। ‘জাতির অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে’, ‘জাতীয়’ না হয়ে ( কথাটা বুর্জোয়ারা যে অর্থে বোঝে মোটেও সেই অর্থে না হলেও) শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে শক্তি সঞ্চয় করা,পরিনত হওয়া, গঠিত হওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু পুঁজিবাদের বিকাশে জাতীয় গণ্ডি ক্রমেই বেশি করে ভাঙতে থাকে, জাতীয় বিচ্ছিন্নতার অবসান এবং জাতিতে জাতিতে বৈরিতার বদলে দেখা দেয় শ্রেণি-বৈরিতা। সুতরাং, বিকশিত পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রে একথা পুরোপুরি সত্য যে, ‘মেহনতিদের স্বদেশ নেই’ এবং অন্ততপক্ষে সুসভ্য দেশগুলির শ্রমিকদের ‘প্রচেষ্টার ঐক্যসাধনই’ হল ‘প্রলেতারিয়েতর মুক্তির অন্যতম প্রথম শর্ত।’(৯)
তথ্য সূত্রঃ
১) ফরাসি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শ্লোগান যা ১৭৮৯ সালের এস্টেটস জেনারেল দিয়ে শুরু এবং ৯ নভেম্বর ১৭৯৯ সালে ১৮ ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থান দিয়ে শেষ হয়।
২)১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণে এঙ্গেলসের টিকা, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’)
৩)মার্কস-এঙ্গেলস,কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ পৃষ্ঠা নং ৫৫, প্রথম খণ্ড, মার্কস এঙ্গেলস রচনাবলী, ন্যাশনল বুক এজেন্সি, কলকাতা।
৪).লেনিন, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ
৫) লেনিন, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ
৬) লেনিন,কার্ল মার্কস, পৃষ্ঠা নং ৫৪, লেনিন রচনা সংকলন,প্রথম খণ্ড।
৭) মার্কস, পুঁজি প্রথম খণ্ড১, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদের শেষ।
৮) মার্কস, পুঁজি প্রথম খণ্ড, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদের শেষ।
৯) মার্কস এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ পৃষ্ঠা নং ৪৪, মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড।
(চলবে)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি