এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আপনাদের কোনো অনুশোচনা আছে কিনা?

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২৬

এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আপনাদের কোনো অনুশোচনা আছে কিনা?

Manual1 Ad Code

ফরিদ ইমন |

বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বহু প্রতীক্ষিত লাইভে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি উত্তর আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

Manual7 Ad Code

সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন—২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আপনাদের কোনো অনুশোচনা আছে কি না, কিংবা আপনারা ক্ষমা চাইবেন কি না?

জয় খুব শান্ত স্বরে বললেন, কোনো হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তার আগে তো নির্ধারণ করতে হবে—আসলে কী ঘটেছিল?

কখনো বলা হয় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, পরে সেই সংখ্যা নেমে আসে চৌদ্দশোতে। সরকারি গেজেটে প্রকাশিত তালিকায় ছিল ৮২০ জন, সেখান থেকেও পরে বহু নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জীবিত ব্যক্তির নাম, আওয়ামী লীগ-সমর্থক পরিবার কিংবা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের নামও সেই তালিকায় থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির সংখ্যাই প্রতিনিয়ত বদলে যায়, তাহলে ইতিহাস কোন সংখ্যাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করবে?

Manual2 Ad Code

তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেগেছে তাঁর আরেকটি প্রশ্ন।

তিনি বলেন, একদিকে হত্যার বিচার দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের পক্ষের সহিংসতায় জড়িতদের জন্য ইন্ডেমনিটি বা দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যদি তারা কোনো অপরাধই না করে থাকে, তাহলে দায়মুক্তির প্রয়োজন কেন? আর যদি দায়মুক্তি দিতেই হয়, তাহলে কি সেটি পরোক্ষভাবে অপরাধের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া নয়?

এক পক্ষের জন্য বিচার, আরেক পক্ষের জন্য দায়মুক্তি—ন্যায়বিচারের পাল্লা কি কখনো এভাবে সমান থাকে? দুই নৌকায় একসঙ্গে পা রেখে যেমন নদী পার হওয়া যায় না, তেমনি ন্যায়বিচারও দ্বৈত মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আগে অবস্থান স্পষ্ট হতে হবে, তারপর আসবে বিচার, অনুশোচনা কিংবা ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন।

Manual2 Ad Code

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের যে প্রতিবেদন নিয়ে এত আলোচনা, সেটিও তারা চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁদের দাবি ছিল—প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির নাম-ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হোক, যাতে স্বাধীনভাবে প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা যায়। কারণ সংখ্যার এই অন্তহীন বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে জরুরি।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬৫০ জন এবং ৫ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আরও ৮২২ জন নিহত হয়েছেন—মোট প্রায় ১,৪০০ জন। কিন্তু শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দুপুরেই পদত্যাগ করেছেন। এরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দায় কীভাবে তাঁর সরকারের ওপর বর্তায়—এই প্রশ্নেরও গ্রহণযোগ্য উত্তর থাকা দরকার।

আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। পুরো ঘটনাকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করাও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও সম্পদে আক্রমণ হয়েছে, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়েছে। এসব ঘটনার অসংখ্য ভিডিও এখনো ইন্টারনেটে রয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কোনো রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং সহিংসতা দমন করার আইনগত ও নৈতিক অধিকার নেই? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রই সেই দায়িত্ব তাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে দেয়। সেই সংঘাতে সাধারণ মানুষ যেমন নিহত হয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন। যদি বিচার হয়, তবে তা সবার জন্যই হতে হবে—একই মানদণ্ডে, একই ন্যায়বোধে।

সবশেষে ব্যক্তিগত একটি অনুভূতির কথা বলি।

সাংবাদিক যখন প্রশ্নটি করছিলেন, তখন আমার নিজেরই মনে হচ্ছিল—এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার উত্তর দিতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাও হয়তো বিচলিত হয়ে পড়তেন। আমিও হয়তো এমন পরিস্থিতিতে গুছিয়ে উত্তর দিতে পারতাম না।

কিন্তু সজীব ওয়াজেদ জয় যেভাবে একেবারে ঠান্ডা মাথায়, ধারাবাহিক যুক্তি দিয়ে এবং আত্মসংযম বজায় রেখে উত্তর দিলেন, তা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। আগে কখনো ভাবিনি, তিনি এতটা পরিণত, এতটা সংযত এবং তাৎক্ষণিকভাবে এত সুসংহতভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

Manual2 Ad Code

কঠিন প্রশ্নের সামনে আবেগ নয়, যুক্তি; উত্তেজনা নয়, স্থিরতা—এই উত্তরটি অন্তত সেই শিক্ষাটাই দিয়ে গেছে। আর সত্যের পথ যদি কোথাও থাকে, তবে সেটি শুরু হয় প্রশ্নকে ভয় না করে, বরং তথ্য, যুক্তি ও ন্যায়বিচারের আলোয় তার উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ